নজর২৪ ডেস্ক- ঢাকাই সিনেমার আলোচিত ও সমালোচিত নায়িকা শামসুন্নাহার স্মৃতি ওরফে পরীমনিকে তৃতীয় দফায় নেওয়া একদিনের রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। শনিবার ঢাকা মহানগর হাকিম আশেক ইমাম শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।
এর আগে শনিবার বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে একটি মাইক্রোবাসে পরীমনিকে আদালতে হাজির করে হাজতখানায় রাখা হয়। এদিন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পুলিশ পরিদর্শক কাজী গোলাম মোস্তফা পরীমনির জামিন আবেদন নাকচ করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। পরীমনি তার পক্ষে জামিন আবেদন না করায় গতকাল নিজের আইনজীবীদের ওপর অনেকটা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এদিকে
এদিকে চিত্রনায়িকা পরীমনির মামলার গতি-প্রকৃতির নজর রাখছেন বিলেত প্রবাসী প্রবীণ সাংবাদিক ও লেখক আব্দুল গাফফার চৌধুরী। ন্যায়বিচার চেয়ে তিনি ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী বরাবর চিঠি পাঠিয়েছেন। আইনি সহায়তার জন্য ব্যারিস্টারদের সঙ্গে কথা বলেছেন। এরইমধ্যে তিনজন ব্যারিস্টার অপারগতা প্রকাশ করেছেন। ক’দিন আগে একজন রাজি হয়েছেন। শেষ পর্যন্ত যদি একজনও রাজি না হন, তাহলে লন্ডন থেকে ব্যারিস্টার পাঠানো হবে।
মহান একুশের গানের রচয়িতা আব্দুল গাফফার চৌধুরী নিজেই গণমাধ্যমকে এই তথ্য জানিয়েছেন। লন্ডনের আইপি টিভি দর্পন-কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আব্দুল গাফফার চৌধুরী আরও বলেছেন, বাংলাদেশে মানবতা ও নাগরিক অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ হচ্ছে। বিশেষ করে, বর্তমান সরকারের আমলে বারবার হস্তক্ষেপ হচ্ছে। তার কথায়, এখানে আইনের শাসন নেই। দেশটি মগের মুলুকে পরিণত হয়েছে।
গাফফার চৌধুরী বলেন, পরীমনির সঙ্গে তার পরিচয় নেই। সরাসরি দেখেননি। ছবিতে দেখেছেন শুধু। কিন্তু হঠাৎ একদিন অনলাইনে দেখলাম চিৎকার করছে আমাকে বাঁচাও বাঁচাও বলে। তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের কোনো অভিযোগ নেই। মাদকাসক্তের অভিযোগ আছে। কিন্তু তাকে গ্রেপ্তারের জন্য যেভাবে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়া র্যাব আসে তা ছিল রীতিমতো ভীতিকর। কোন আদেশে আসলো? তা জানার চেষ্টা করলাম। অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখি, সে আক্রোশের শিকার। একদিকে অর্থশক্তি। অন্যদিকে রাষ্ট্রশক্তি।
লন্ডনে আমার বন্ধু কয়েকজন পুলিশ অফিসারের সঙ্গে কথা বললাম। তারা আমাকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বললেন, ওকে ধ্বংস করার জন্য এগুলো করছে। একজন নায়িকার বাড়িতে মদ পাওয়া যাবে না, এটাই বা কি করে আশা করি! তার বাসায় এলএসডি পাওয়া গেছে। আমার ধারণা, এটা সাজানো হয়েছে। যাইহোক, তার পক্ষে কিছু লোক দাঁড়িয়েছে। আমিও দাঁড়িয়েছি। প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি লিখেছি। খবরের কাগজে লিখেছি। ১৭ জন বিশিষ্ট নাগরিক বিবৃতি দিয়েছেন। কোনো সাড়া মেলেনি।
গাফফার চৌধুরীর আশা ছিল, যে দলকে তিনি পঞ্চাশ বছর ধরে সমর্থন করেন, প্রধানমন্ত্রীকে নিজের মেয়ের মতো জানেন, তারা আমাকে কিছু বলবেন। অন্তত এটা বলতে পারতেন- আমি কিছু করতে পারবো না। তখন ছিল অন্য কথা। দুর্ভাগ্য, তিনি আমাকে সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করেছেন। আমার কথা হচ্ছে, পরীমনি দোষী হলে নিয়মমাফিক তার বিচার হবে। আমি বিচারের বিরুদ্ধে নই। কিন্তু তাকে ধরার সাথে সাথে বলা হচ্ছে, রাতের রানী। এভাবে চরিত্রহনন সম্পূর্ণ বেআইনি। অন্য কোনো দেশে হলে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হতো।
প্রবীণ এই সাংবাদিক সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে বলেন, তার একবার কথা হয়েছে। তিনি এতোটাই ভয় পেয়েছেন যে, এখন আর ফোন ধরেন না। চয়নিকাকে যেভাবে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, তা অসভ্যতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য লজ্জাকর। কি আর বলবো! পরীমনি মেয়েটি অসম্ভব সুন্দরী। গরিবের ঘর থেকে এসেছে। এটাও একটা অপরাধ। বলা হচ্ছে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। আজও জানা গেল না সুনির্দিষ্ট অভিযোগটা কি? মদের বার নেই গুলশান,বনানীতে এমন বাড়ি কি আছে?
উল্লেখ্য, গত ৪ আগস্ট পরীমনিকে তার বনানীর বাসা থেকে মাদকদ্রব্যসহ আটক করে র্যাব। পরের দিন তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা হয়। এই মামলায় তিন দফায় ৭ দিনের রিমান্ড শেষে এই অভিনেত্রীকে গতকাল শনিবার (২২ আগস্ট) কারাগারে পাঠায় আদালত।
পরীমনির মুক্তির দাবিতে প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ জানিয়ে গত ১০ আগস্ট সংবাদমাধ্যমে একটি বিবৃতি পাঠান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানের রচয়িতা গাফ্ফার।
আবেদনে লন্ডন প্রবাসী প্রবীণ এই সাংবাদিক লিখেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে এই আবেদন তার একার নয়। দেশে প্রশাসন, একটি বিত্তশালী এবং মিডিয়া গোষ্ঠী মিলে ২৮ বছরের একটি তরুণীকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার যে ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে, এটি সে সম্পর্কে সচেতন নাগরিক সমাজের আবেদন।
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী লিখেছেন, পরীমণিকে গ্রেপ্তারের জন্য দু-চারজন র্যাব কিংবা পুলিশের সদস্য গেলেই হতো।
সেখানে যে যুদ্ধযাত্রা করা হয়েছিল, তাতে মনে হয়েছিল কোনো ভয়ংকর ডাকাতকে গ্রেপ্তারের জন্য এই আয়োজন। গ্রেপ্তারের পর থেকেই পরীমণির বিরুদ্ধে একটার পর একটা স্ক্যান্ডাল ছড়ানো হচ্ছে। এটা বোঝাই যায়, কোনো একটি মহল থেকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে এই স্ক্যান্ডাল ছড়ানো হচ্ছে। অর্থাৎ বিচারের আগেই বিচার। চয়নিকা চৌধুরীর মতো একজন বিখ্যাত নাট্যকারকে অহেতুক রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে তার চরিত্রে কালিমালেপনের চেষ্টা করা হয়েছে। এগুলো ক্ষমতার বাড়াবাড়ি। এগুলো চলতে দিলে দেশের নাগরিক স্বাধীনতা বিপন্ন হবে।
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী লিখেছেন, বোট ক্লাবের ঘটনার পরে আসামিরা যে সহজেই জামিন পেল তার রহস্য কী? এই শক্তিশালী মহলটি প্রশাসনের একাংশকে বশ করে যে এই ঘটনাগুলো সাজিয়েছে, তা বুঝতে কি কষ্ট হওয়ার কথা? তারপর মিডিয়া প্রচার। এই প্রচারগুলো যে সত্য নয়, তা সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিনের বিবৃতিতেও জানা গেছে। সাড়ে তিন কোটি টাকার গাড়ি নিয়ে পরীমণির বিরুদ্ধে যে অপপ্রচার চালানো হয়েছে, আরেফিন সাহেবের বিবৃতিতে তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।
পরীমণির ব্যক্তিগত সম্পর্ক ঘিরে প্রচারণার কথা উল্লেখ করে এই প্রথিতযশা সাংবাদিক লিখেছেন, পরীমণি চলচ্চিত্রের নায়িকা। নানাবিধ পুরুষের সঙ্গেই তার সম্পর্ক থাকতে পারে। সেটা কি অপরাধ? সবিনয় জিজ্ঞাসা, আদালতে বিচার হওয়ার আগে দেশের চলচ্চিত্র জগতের সম্ভাবনাময় তরুণীর জীবন যেভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হলো, তার দায় কে নেবে?
আদালতের বিচারে পরীমণি যদি দোষী সাব্যস্ত হয় এবং শাস্তি পায়, তাতে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু একজন তরুণীকে যেভাবে আটক করে হেনস্তা করা হচ্ছে এবং তার বিরুদ্ধে অপ্রমাণিত অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, তা শুধু নারী সমাজের অপমান নয়, মানবতার অপমান। এটা আমাদের নাগরিক স্বাধীনতার ওপর একটি ভয়ংকর থাবা।
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী আরও লিখেছেন, বাংলাদেশে শেখ হাসিনার শাসনামলেই নারীদের ক্ষমতায়ন শুরু হয়েছে। সে জন্যই তার কাছে সবিনয় আবেদন, পরীমণির ব্যাপারে তিনি হস্তক্ষেপ করুন। তাকে বিচার থেকে রক্ষা করতে বলি না। তাকে হায়েনা গোষ্ঠীর হাত থেকে বাঁচানোর জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি। পরীমণির সঙ্গে যে আচরণ করা হচ্ছে, তা যে দেশের আরেকজন নাগরিকের ওপর করা হবে না, তার নিশ্চয়তা কী?
তিনি বলেন, দেশের সচেতন বুদ্ধিজীবী শ্রেণির কাছে আবেদন করি, পরীমণির ওপর এই হেনস্তার প্রতিবাদ করুন। দয়া করে চুপ থাকবেন না। পরীমণির ওপর অত্যাচারের নিন্দা করুন। মিডিয়ার কাছে অনুরোধ, তারা যেন অত্যাচারিতের পক্ষে দাঁড়ান। অত্যাচারী গোষ্ঠীর পক্ষে না যান।
