শেষপর্যন্ত পরিবহন নেতাদের কাছে ‘নতিস্বীকার’, শিথিল হচ্ছে সড়ক আইন

নজর২৪ ডেস্ক- শেষ পর্যন্ত জয়টা হলো পরিবহন নেতাদেরই। তাদের দাবির কাছে নতি স্বীকার করে শিথিল করা হচ্ছে বহুল আলোচিত সড়ক পরিবহন আইন। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের নজিরবিহীন আন্দোলনের মুখে ২০১৮ সালে পাস হয় আট বছর ধরে ঝুলে থাকা আইনটি। কার্যকর করা হয় ২০১৯ সালের ১ নভেম্বর।

 

পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা অবশ্য তখনই আইনটিকে কঠোর ও তাদের স্বার্থবিরোধী আখ্যা দিয়ে আন্দোলনে নামেন। আইন শিথিলের দাবিতে সারাদেশেই বন্ধ করে দেন যান চলাচল। ওই সময় ব্যাপক জনদুর্ভোগের মুখে নয়টি ধারার প্রয়োগ স্থগিত রাখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের নেতৃত্বাধীন সরকারের কমিটি। এর মধ্যে তলে তলে জল গড়িয়েছে বহুদূর।

 

আইনের বিভিন্ন ধারা সংশোধান করে জেল-জরিমানা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। সর্বাত্মক লকডাউন শুরুর একদিন আগে গত ১৩ এপ্রিল সংশোধিত আইনের খসড়াটি বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। এক মাস সময় দিয়ে আগামী ১৩ মে পর্যন্ত খসড়ার ওপর অংশীজন ও জনসাধারণকে মতামত জানাতে বলা হয়েছে। এর পর সেটি আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য পেশ করা হবে।

 

অনুমোদন পেলে উত্থাপন করা হবে সংসদে। সেখানে পাস হলেই কার্যকর হবে সংশোধনী আইনটি। এদিকে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো ৩৪টি ধারা সংশোধনের দাবি জানিয়ে সরকারকে কয়েক দফা চিঠি দিয়েছিল। তাদের সঙ্গে বছর দুয়েক আলোচনার পর সংশোধনের যে খসড়া প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের দাবিরই প্রতিফলন বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।

 

সংশোধিত খসড়া অনুযায়ী, আইনের ১২৬টি ধারার ২৯টিতেই পরিবর্তনের প্রস্তাব এনেছে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়। ভারী ও মাঝারি মোটরযানের সংজ্ঞাসহ আটটি বিষয়ের সংজ্ঞাও পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে সংধোনীর খসড়ায়। তবে সবচেয়ে স্পর্শকাতর পরিবর্তনের প্রস্তাবটি হলো দুর্ঘটনায় প্রাণহানির জরিমানা পাঁচ থেকে কমিয়ে তিন লাখ করা। এ অপরাধের মামলা জামিন অযোগ্য থাকলেও, পরিবহন নেতাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে জামিনযোগ্য করা হচ্ছে। আর সেটি কার্যক্রর হলে, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালিয়ে কাউকে আহত করা এবং গাড়ির আকার আকৃতি পরিবর্তনের মামলায় আসামির জামিন পেতে বাধা থাকবে না।

 

আইন সংশোধনের এ উদ্যোগকে পরিবহন নেতাদেরই দাবি পূরণ বলছেন নিরাপদ সড়ক চাই-এর (নিসচা) চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন। কঠোর সড়ক আইনের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া এ চিত্রনায়ক বলেন, ‘পরিবহন নেতাদের চাপে আইনটি পরিবর্তন করা হলে সড়ক আরও অনিরাপদ হবে। সবার সম্মিলিত চেষ্টার পর শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে একটি গণজাগরণ তৈরি হয়েছিল আইনটির পক্ষে। সে কারণেই আইনটি হয়েছিল।’

 

সড়ক পরিবহনে সবচেয়ে আলোচিত ধারা ১০৫-তে জরিমানা কমানোর সুপারিশ করা হয়েছে। বিদ্যমান আইনে দুর্ঘটনায় প্রাণহানি হলে দ-বিধি ৩০৪(খ) ধারায় চালকের বিরুদ্ধে মামলা হয়। এ ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি তিন বছর কারাদন্ড।

 

তবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে তা বাড়িয়ে পাঁচ বছর করা হয়েছিল। সঙ্গে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার বিধান। আইনের সংশোধনীতে জরিমানা কমিয়ে তিন লাখ টাকা করার প্রস্তাব আনা হয়েছে। এতে বলা হয়েছেÑ আদালত অর্থদ-ের সম্পূর্ণ বা অংশবিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারবেন।

 

আইনের ৪০ ধারা লঙ্ঘন অর্থাৎ গাড়ির আকার আকৃতি পরিবর্তনের অপরাধে ৯৮ ধারা অনুয়ায়ী সর্বোচ্চ তিন বছর জেল এবং সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। এ ধারায় পরিবর্তন না হলেও, অপরাধটিকে জামিনযোগ্য করার প্রস্তাব করা হরেছে। অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালিয়ে কাউকে আহত করার অপরাধে ৯৮ ধারায় হওয়া মামলাও জামিনঅযোগ্য।

 

খসড়ায় এ দুটি ধারাকে জামিনযোগ্য করার সুপারিশ এসেছে। এ ধারায় সংঘঠিত অপরাধকে আপসযোগ্য করারও প্রস্তাব হয়েছে খসড়ায়। তবে প্রাণহানির ক্ষেত্রে আগের মতো ১০৫ ধারা জামিন অযোগ্যই থাকছে।

 

পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা চালকের শিক্ষাগত যোগ্যতা কমানোর দাবি করেছিলেন। আইনের ৫ নম্বর ধারায় আছে, পেশাদার চালক হতে অষ্টম শ্রেণি পাস করতে হবে। সংশোধনের খসড়ায় বলা হয়েছেÑ তিন চাকার যানবাহনের পেশাদার চালক পঞ্চম শ্রেণি পাস করলেই লাইসেন্স পাবেন।

 

আর ১০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকলে পরীক্ষা দিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স নিতে পারবেন বাস-ট্রাকের কন্ডাক্টর বা সুপারভাইজার। তাদের জন্য কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্ত-ই রাখা হয়নি। আইনের ১৪ ও ১৫ ধারা সংশোধন করে কন্ডাক্টরের সঙ্গে সুপারভাইজার পদটি যুক্ত করা হয়েছে। এ পদে কাউকে নিয়োগ দিলে নিয়োগপত্র দিতে হবে মালিককে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *