ভাস্কর্য ভাঙচুর: যুবলীগ নেতার গ্রেপ্তার নিয়ে যা বলছেন কুষ্টিয়ার রাজনীতিকরা

নজর২৪ ডেস্ক- কুষ্টিয়ার কুমারখালীর কয়া ইউনিয়নে কয়া মহাবিদ্যালয়ের সামনে নির্মিত ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অগ্রনায়ক যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ওরফে বিপ্লবী বাঘা যতীনের ভাস্কর্য ১৮ ডিসেম্বরে রাতের আঁধারে ভেঙে দেয় দুর্বৃত্তরা।

 

এর আগে গত ৫ ডিসেম্বর কুষ্টিয়ার পাঁচ রাস্তার মোড়ে নির্মাণাধীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হয়। পরপর এ দুটি ঘটনার প্রতিবাদে সারা দেশে ব্যাপক প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ শুরু হয়। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুরে জড়িত থাকার অভিযোগে দুই মাদ্রাসাছাত্রকে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে তারা ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন।

 

এদিকে বাঘা যতীনের ভাস্কর্য ভাঙার অভিযোগে পুলিশ ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে স্থানীয় যুবলীগ সভাপতিসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত আরো একজন পলাতক আছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়।

 

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুর নিয়ে যেমন জেলার বিভিন্ন মহলে ব্যাপক প্রতিবাদ ছিল, তেমনি বাঘা যতীনের ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনায় স্থানীয় কয়া ইউনিয়ন যুবলীগ সভাপতি আনিচুর রহমানের সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগের বিষয়টিও এখন শহরজুড়ে ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় মহাবিদ্যালয়ের পরিচালনা পরিষদ নিয়ে সৃষ্ট বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতেই এই ঘটনা ঘটানো হয় এবং এর মূল পরিকল্পনাকারী আনিচুর রহমান।

 

বিষয়টি নিয়ে কুষ্টিয়ার রাজনীতিতে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য। বিশেষ করে ভাস্কর্য ভাঙচুরের পর ঘটনাটি জানাজানি হলে পুলিশ প্রশাসন, জেলা প্রশাসন, সকল শ্রেণির গণমাধ্যমকর্মী, বিভিন্ন রাজনীতিক, সমাজকর্মীসহ স্থানীয় এলাকাবাসীর পাশাপাশি আশপাশের এলাকার লোকজন জড়ো হন কয়া মহাবিদ্যালয় মাঠে।

 

সে সময় সেখানে যান কুষ্টিয়া জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান জিয়াউল হক স্বপন। সে সময় তিনি বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। সেই সময়ও ভাস্কর্য ভাঙচুরের দায়ে গ্রেপ্তার আনিচুর রহমানকে ওই নেতার পাশে দেখা যায়।

 

এলাকাবাসী বলছে, জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জিয়াউল হক স্বপনের বডিগার্ড হিসেবেই পরিচিত ছিল আনিচুর। স্বপনের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে আনিচুর এলাকায় ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে রেখেছে। এই ঘটনার সঙ্গে আরো কোনো রাঘববোয়াল জড়িত থাকতে পারে বলেও তারা মন্তব্য করেন।

 

তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জিয়াউল হক স্বপন বলেন, ‘আমি রাজনীতি করি, সেই সঙ্গে এলাকার চেয়ারম্যান। তাই অনেকের সঙ্গে আমার সখ্য আছে। তা ছাড়া, আনিচুর এলাকার ভদ্র ছেলে বলেই পরিচিত। জামায়াত-বিএনপির সময় তারা অনেকবার নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ওই এলাকা জামায়াতের ঘাঁটি হওয়ার কারণে ওরাই এলাকা থেকে জামায়াতের বিপক্ষে শক্ত প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। তারপরও কোনো ব্যক্তির অপকর্মের দায় দল নেবে না। তাই আমরা তাকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করেছি। তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে স্থায়ীভাবে তাকে বহিষ্কার করা হবে।

 

জানতে চাইলে জেলা জাসদের সভাপতি গোলাম মহসিন বলেন, প্রথমত যেকোনো সরকারবিরোধী কাজই ন্যক্কারজনক। আমার ধারণা, কিছুদিন আগে কুষ্টিয়ায় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হয়েছিল, সেটা নিয়ে প্রশাসন ও জনগণ যেভাবে প্রতিবাদ করছিল সেদিক থেকে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরানোর একটা নোংরা চেষ্টা হতে পারে। এ ব্যাপারে প্রশাসনের উচিত আরো গভীরভাবে তদন্ত করা। এ নেতাদের যারা আশ্রয় এবং প্রশ্রয়দাতা, তাদেরও দল থেকে বহিষ্কার করে আইনের আওতায় আনা দরকার। স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধের জন্য এই কাজ করা হলেও এতে অজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে ওই সব রাজনৈতিক নেতা।

 

জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক, সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিন বলেন, সরকার বিভিন্ন সময় এসব ভাঙচুরের ঘটনায় বিএনপিসহ আমাদের জোটের শরিকদের দায়ী করে আসছে। কিন্তু কুমারখালীতে বাঘা যতীনের ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনায় যুবলীগ নেতার জড়িত থাকার ঘটনা প্রমাণ করে এসব ঘটনা তারাই ঘটিয়ে বিরোধী দলের ওপর নিপীড়ন চালায়। এটা বিএনপি ও জোটের নেতাদের বিরুদ্ধে হামলা-মামলা দেয়ার একটা প্রক্রিয়া।

 

ওয়ার্কার্স পার্টির কুষ্টিয়া শহর শাখার সাধারণ সম্পাদক সোহেল রানা বলেন, রাজনীতিতে ভিলেজ পলিটিক্স বলে একটা কথা আছে। কিন্তু তার মানে এই না যে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে গিয়ে কোনো জাতীয় ইস্যু নিয়ে নোংরামি করতে হবে। এর সঙ্গে যারা সরাসরি জড়িত এবং যারা এর পৃষ্ঠপোষক তাদের সবার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

 

পুলিশ সুপার তারভীর আরাফত বলেন, সরকারবিরোধী যেকোনো কাজের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে, তিনি যে দলেরই হোক না কেন। অন্যায় করে আইনের চোখ ফাঁকি দেয়ার কোনো সুযোগ বর্তমানে নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *