পদ্মা সেতু উদ্বোধনের দিন বিয়ে করবেন হাসান-তৃমা

দু’জনের বাড়ি প্রমত্ত পদ্মার দুই প্রান্তে। সাভারে বাড়ি হাসান মাহমুদের। আর সারজিনা হোসাইন তৃমার বাড়ি নদীর অন্য পাড়ের গোপালগঞ্জে। তবে যোগাযোগের বাধা দু’জনের মন দেওয়া-নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। দুজনের অভিভাবকরা সেই প্রেমের সম্পর্ক মেনে নিয়েছিল। সেই সঙ্গে সংসার পাতার জন্যও চাপ দিয়েছিল।

কিন্তু সেই চাপ উপেক্ষা করে হাসান-তৃমা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের দিনেই জীবনের নতুন ইনিংস শুরু করবে। তীব্র আপত্তি জানিয়েছিলেন অভিভাবকরা। কিন্তু নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল প্রেমিক যুগলকে নিজেদের অবস্থান থেকে এক চুল নড়ানো যায়নি। অবশেষে হাসান-তৃমার সেই স্বপ্নপূরণ হতে চলেছে।

২৫শে জুন উদ্বোধন হচ্ছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষার স্বপ্নের পদ্মা সেতুর। এই সেতুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের মানুষের নানা আবেগ ও অনুভূতি। এদিনেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন প্রেমিক যুগল।

জানা যায়, গোপালগঞ্জের মেয়ে সারজিনা হোসাঈন তৃমার প্রেমের সম্পর্কের একপর্যায়ে হাসান কিছুটা মজা করে তৃমাকে বলেছিলেন, ’ফেরিতে করে পদ্মা পাড়ি দিয়ে বিয়ে করাটা কঠিনই হয়ে যাবে।’ এর কিছুদিন পর শুরু হয় পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ। তখনই হাসান তৃমাকে প্রস্তাব দেন পদ্মা সেতু উদ্বোধনের দিনই বিয়ে করবেন। তৃমাও তাতে রাজি হয়ে যান।

হাসান-তৃমার সম্পর্কের কথা উভয় পরিবারই জানে। তবে, তাদের বিয়ে নিয়ে দুই পরিবারের সদস্যরা তাড়া দিচ্ছিলেন। তাই বিয়ের তারিখ নিয়ে পরিকল্পনার কথা পরিবারকে জানালে উভয় পরিবার বেঁকে বসে।

এ বিষয়ে হাসান বলেন, ‘অভিভাবকদের চাপ সত্ত্বেও আমি আমার পরিকল্পনায় অটল থাকি। বলা যায়, বিয়েটা ঠেকিয়ে রাখি। আমাকে সমর্থন দেয় তৃমা।’ আর তৃমা বলেন, ‘আমরা দুজনেই একটা কথা ভেবেছি। আমরা একটা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছি। তাই আমরা আমাদের বিয়েটা স্মরণীয় করে রাখার পরিকল্পনায় স্থির থাকি।’

২০২০ সালের ১০ই ডিসেম্বর পদ্মা সেতুর সবশেষ স্প্যান বসানোর পর হাসান-তৃমার চোখে-মুখে বয়ে যায় খুশির ঝিলিক। এবার তারা শুরু করেন বিয়ের পারিবারিক পর্যায়ের আনুষ্ঠানিকতাগুলো এগিয়ে নিতে।

এ বছরের ২৪শে মে যখন ঘোষণা হয় ২৫শে জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু উদ্বোধন করবেন। তখন হাসান-তৃমার কাছে এ ঘোষণা আসে তাদের বিয়ের তারিখ হয়ে। একদিকে পদ্মা সেতু উদ্বোধনে সরকারের জোর প্রস্তুতির সঙ্গে চলতে থাকে, অন্যদিকে দুই পরিবারে শুরু হয় হাসান-তৃমার বিয়ের আয়োজন।

১৪ই জুন সন্ধ্যায় প্রথমবারের মতো পুরো পদ্মা সেতু আলোকিত হয়। ১৭ই জুন সন্ধ্যায় হয় হাসানের গায়েহলুদ হয়। তৃমার গায়েহলুদ হবে ২৪শে জুন ঢাকায়। সে জন্য এখন চলছে প্রস্তুতি।

হাসানের গায়েহলুদের ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে ঘনিষ্ঠজন সজীব মিয়া ফেসবুকে লিখেছেন, ‘পদ্মা সেতুতে যত দিন পাবলিক পরিবহন না চলছে, তত দিন কবুল না বলার সিদ্ধান্তে অটল ছিল হাসান ভাই। পদ্মা সেতুর আলো জ্বলেছে, এবার আলো জ্বলল হাসান ভাইয়ের হলুদ-সন্ধ্যার।’

মঙ্গলবার (২১শে জুন) বিকেলে হাসান তার ফেসবুকে লিখেন, ‘স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধন উপলক্ষে ২৫শে জুন বিয়ের পরিকল্পনা করেছি। সবার আশীর্বাদ প্রত্যাশা করছি।’

ফেসবুক পোস্টে বিয়ের কার্ড জুড়ে দিয়েছেন হাসান। কার্ড অনুযায়ী, বিয়ে ২৫শে জুন। বিবাহোত্তর সংবর্ধনা ১লা জুলাই। কার্ডের বাঁ-দিকে হাতে আঁকা একটি চিত্রকর্ম রয়েছে। গ্রামীণ পরিবেশে বিয়ের চিত্রকর্মটি এঁকেছেন তৃমা। কার্ডের নিচের অংশের ওপাশজুড়ে রয়েছে পদ্মা সেতুর প্রতীকী অলংকরণ।

এ বিষয়ে তৃমা বলেন, পদ্মা সেতু সাহস, দৃঢ়তা ও বিজয়ের প্রতীক। আমাদের প্রেম থেকে পরিণয়ের দীর্ঘ যাত্রা এই সেতুর মতো সাহস-দৃঢ়তা ও বিজয়েরই আখ্যান হতে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে হাসান বলেন, বিয়ের কার্ডের ধারণাটি আমার। একটি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে কার্ড করিয়েছি। কার্ডে ঐতিহ্যবাহী জামদানি ব্যবহার করা হয়েছে। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের দিনকে কেন্দ্র করে আমাদের বিয়ের পরিকল্পনা। তাই কার্ডে পদ্মা সেতুর প্রতীকী অলংকরণ রাখা হয়েছে। এই কার্ড সেতুবন্ধনের বার্তা দেয়।

হাসান মাহমুদ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিসংখ্যানে স্নাতক এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে বর্তমানে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। আর তৃমা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে পড়াশুনা শেষ করে এখন একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *