নেত্রকোণা: অতিবৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলের পানিতে নেত্রকোণা জেলার প্রায় সব উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে নেত্রকোণার দুর্গাপুর, কলমাকান্দা, মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরি উপজেলার নিম্নাঞ্চলগুলো ইতোমধ্যেই তলিয়ে গেছে। এসব উপজেলার উঁচু ভূমিগুলোও তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় রয়েছে।
পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণের ফলে জেলার প্রধান নদ-নদী সোমেশ্বরী, কংস, মগড়া, উব্দাখালী ও ধনুসহ হাওরগুলোর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড। শুক্রবার (১৭ জুন) দুপুর পর্যন্ত জেলার কলমাকান্দা উপজেলার ডাকবাংলা পয়েন্টে উব্দাখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ৬১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল বলেন জানান পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্থানীয় পরিমাপক মোবারক হোসেন।
গত ২৪ ঘণ্টায় কলমাকান্দায় ১১৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এতে কলমাকান্দা উপজেলা পরিষদ, নয়াপাড়া, মুক্তিচর, বিশরপাশা, বাউশাম, হরিপুর চকবাজার, আনন্দপুর, বরুয়াকোনা, রংছাতি ও বড়খাঁপন কাঁচা ও পাকা সড়ক প্লাবিত হয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। জেলার দুর্গাপুর উপজেলা সদরসহ কুল্লাগড়া, গাওকান্দিয়া ইউনিয়নে বাড়িঘর, দোকানপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। এ দুই উপজেলার সঙ্গে প্রায় সবকটি ইউনিয়নের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলার তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের জৈনপুর, ভাটাপাড়া, রঘুরামপুর, ফাগুয়া, হানবীর, বড়পাইকুড়া, গজধার, পশুখালী, হরিপুর, আজমপুর, নোওয়াগাঁও, ধুলিয়া ও উদয়পুরসহ বেশ কিছু এলাকা নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। প্লাবিত হয়েছে জেলার বারহাট্টা উপজেলার অনেক এলাকাও। এছাড়া প্লাবিত হয়েছে বিভিন্ন রাস্তাঘাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অতিবর্ষণের ফলে নতুন কিছু এলাকা প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি জেলার কমপক্ষে তিন সহস্রাধিক পুকুর ও ঘেরের মাছ ভেসে গেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
এছাড়াও দুর্গাপুর উপজেলার প্রধান নদী সোমেশ্বরীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকার কারণে নদী ভাঙনের কবলে পড়েছে নদী তীরবর্তী ফারংপাড়া গ্রামসহ কয়েকটি গ্রামের মানুষ। নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ায় হাজারো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবুল হাসেম বলেন, কলমাকান্দার সব এলাকায়ই এখন বন্যার পানি। ইউএনও কার্যালয়, উপজেলা পরিষদসহ শহরে হাঁটুপানি থেকে কোমর পানি রয়েছে। বন্যকবলিতরা যাতে আশ্রয় নিতে পারেন, সেজন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে।
নেত্রকোণা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহন লাল সৈকত বলেন, ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোণার কংস, সোমেশ্বরী, ধনু, উব্দাখালীসহ ছোট-বড় সব নদ-নদী ও হাওরের পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিস বলেন, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এরইমধ্যে বন্যা কবলিত প্রতিটি উপজেলায় ২০ মেট্রিক টন করে চাল ও নগদ দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে শুকনো খাবার বিতরণসহ ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত থাকবে।
এদিকে সিলেটের চলমান বন্যা পরিস্থিতি আগামী দুই থেকে তিন দিন আরও অবনতি হতে পারে বলে জানিয়েছেন বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া। শুক্রবার (১৭ জুন) বিকালে সংবাদ মাধ্যমকে তিনি এ তথ্য জানান।
আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, বাংলাদেশে এই মুহূর্তে ১৩টি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বিশেষ করে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট ও সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চলগুলো প্লাবিত হচ্ছে। এ অঞ্চলগুলোতে বাড়ি-ঘর, রাস্তা-ঘাট পানিতে তলিয়ে গেছে। যার ফলে মানুষের সাধারণ জীবন-যাপন ব্যাহত হচ্ছে।
তিনি বলেন, উজানে এখনো ভারি বর্ষণ অব্যাহত আছে। বিশেষ করে উজানের মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে অত্যাধিক ভারি বর্ষণের রেকর্ড করা হয়েছে। এ বৃষ্টির পানি সিলেট এবং সুনামগঞ্জের ওপর দিয়ে দ্রুত নেমে আসায় সেখানে এ বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। এ পরিস্থিতির অবস্থা আগামী দুই থেকে তিন দিন আরও খারাপ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এটি বেশি দিন দীর্ঘায়িত হবে না। এ বন্যার স্থায়িত্ব সাত থেকে দশ দিন হতে পারে।
