শুটিং দেখতে এসে অভিনয় করার সুযোগ পেয়ে গিয়েছিলেন রেনু নামে মফস্বল শহর থেকে ঢাকায় আসা একটি মেয়ে। দৃশ্য ছিল ট্রেতে করে কিছু জিনিস নিয়ে এসে টেবিলে রাখার। এই ছোট্ট দৃশ্যের জন্য তিনি পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন ১০ টাকা। অভিনয়ের পেশায় সেটি তার প্রথম আয়।
সেই রেনু পরে হয়ে ওঠেন চিত্রনায়িকা রোজিনা। ওই প্রথম অভিনয়ের কয়েক বছরের মাথায় তিনি গাড়ি কেনেন ৭০ হাজার টাকায়। ব্যস্ত হয়ে যান সিনেমায়। এক দিনে তিন-চারটি সিনেমার শুটিং করেছেন এ অভিনেত্রী। জিতেছেন দর্শকের হৃদয়।
কসাই সিনেমার জন্য ১৯৮০ সালে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রী ও ১৯৮৮ সালে জীবনধারা সিনেমার জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে পান জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।
বর্তমানে লন্ডন প্রবাসী রোজিনা মাঝে মাঝেই দেশে আসেন। ফিরে দেখা নামে সম্প্রতি একটি সিনেমা পরিচালনা করেছেন। সেটা মুক্তি দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। আরেকটি সিনেমা করার ইচ্ছা আছে তার।
চলচ্চিত্রে অভিনয়ে আসা, শৈশব, বেড়ে ওঠাসহ নানা বিষয় নিয়ে রোজিনা কথা বলেছেন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে।
রোজিনার নিজের ভাষ্যে:
‘জন্ম আমার গোয়ালন্দে, নানির বাড়িতে। রাজবাড়ি আমার বাবার বাড়ি। ‘আমরা চার বোন, দুই ভাই। শৈশবের অনেকটা সময় আমার গোয়ালন্দে কেটেছে। স্কুলজীবনটা আমার ছিল রাজবাড়িতেই।’
যেভাবে ঢাকায় আসা
‘শাবানা ম্যাডাম, কবরী ম্যাডামদের দেখে ভাবতাম, এভাবে নাচব, গাইব, অভিনয় করব। আমার বাবার সঙ্গে ব্যবসা করতেন আলীজান ভাই। তিনি আমাদের বাড়িতে আসতেন, আমরা কখনও ঢাকা গেলে তার ওখানে যেতাম। পুরান ঢাকায় থাকতেন তিনি। তারা এলাকায় বাৎসরিক নাটকের অনুষ্ঠান করতেন। বাবার কাছে এলে অনেক সময় এসব নিয়ে গল্প করতেন। ওনার আবার চলচ্চিত্রের কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচয় ছিল। আমি তাকে মাঝে মাঝে বলতাম, “আমি অভিনয় করব, আমাকে নিয়ে যান।” তিনি বলতেন যে “না, খালাম্মা তোকে যেতে দেবে না।”
‘একদিন আমার মা খুব মেরেছিল। আমি রাগ করে চলে গিয়েছিলাম আলী ভাইদের বাড়িতে। এভাবে আমার চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য পা বাড়ানো।
‘সিনেমায় অভিনয় করে যে টাকা পাওয়া যায়, আমি জানতাম না। এটা ১৯৭৭ সালের মাঝামাঝি সময়ের কথা বলছি।
‘আমার মা ভেবেছিলেন, আমি গোয়ালন্দে গিয়েছি। এক দিন পর খবর নিয়ে দেখেন যে আমি নানাবাড়ি যাইনি। মা তো খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন। তখন নানা-মামা বেঁচে ছিলেন। পরে আমার চাচা দুই দিন পর ঢাকা গেলেন ছবি নিয়ে। পরে তিনি দেখলেন, আমি আলীজানদের বাড়িতে।
‘পরে আমার মা চলে এলেন ঢাকায়। যখনই শুনলাম মা আসছেন, আমি তো এই বাড়ি পালাই, সেই বাড়ি পালাই, চৌকির নিচে লুকাই। আমার মা দৌড়াচ্ছেন আমার পিছে পিছে। আমার মা দুই দিন থেকে আবার চলে গেলেন।’
প্রথম অভিনয়
‘আলী ভাইরা একটা নাটকের মহড়া দিচ্ছিলেন, বাৎসরিক নাটক। আমি সেই মহড়া গিয়ে দেখতাম। যেদিন নাটকটি মঞ্চস্থ হবে, তার দুই দিন আগে হিরোইন অসুস্থ হয়ে গেল। পরে আমাকে বলা হলো অভিনয় করতে।
‘রিহার্সেল না করে কীভাবে অভিনয় করব, আমি তো না না করছিলাম, কিন্তু তাতে কাজ হলো না। আমাকে কাজটা করতেই হলো। দুই দিন রিহার্সেল করেছি। লালবাগের শায়েস্তা খান হলে সেই নাটক মঞ্চস্থ হয়।
‘আলী ভাইয়ের পরিচিত চলচ্চিত্রের কিছু মানুষ এসেছিলেন সেই নাটকের শো-তে। ওখান থেকে আমি একটি বিজ্ঞাপনের অফার পাই। বিজ্ঞাপনটি ছিল মায়া বড়ির (জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল)।
ক্যামেরার সামনে প্রথম
‘খেজুর বাগানে বেরাতে গিয়েছিলাম। তখনও সংসদ ভবন উদ্বোধন হয়নি। আলী ভাই আর তার ভাগনিদের সঙ্গে গিয়েছিলাম। দেখি শুটিং হচ্ছে। সিনেমাটির নাম ছিল জানোয়ার। কালীদাশ বাবু ছিলেন পরিচালক আর ওয়াসিম ভাই ছিলেন হিরো, হিরোইন ছিলেন সুচরিতা ম্যাডাম।
‘শুটিংটা ছিল এমন যে, একটা মঞ্চ। সেখানে নাচ হবে। সামনে টেবিল, তার ওপর বিভিন্ন রকম বোতল।
‘আমরা দাঁড়িয়ে আছি। একজন লোক আমাকে ডাকলেন। পরে বুঝেছি উনি সহকারী পরিচালক। তিনি এসে বললেন, এই মেয়ে এদিকে আস। সবাই তো হতভম্ব। কেন ডাকছে। পরে সেই সহকারী পরিচালক বুঝিয়ে দিলেন যে, তাদের একটি দৃশ্যের জন্য একজন মেয়ে দরকার।
‘দৃশ্যটি এমন: একটা মেয়ে ট্রে-তে করে বোতল-গ্লাস নিয়ে গিয়ে টেবিলে রাখবে। এটাই তার কাজ এবং এটাই হলো দৃশ্য।
‘আমি গেলাম। আমাকে মেকআপ রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। প্যান্ট-শার্ট পরানো হলো। গায়ে লাগছিল না। তারপরও জোর করে পরানো হলো। পরে ফ্লোরে এসে রিহার্সেল দিলাম। দারাশিকো ছিলেন, শর্বরী ম্যাডাম ছিলেন নৃত্যে।
‘আমার শুটিং হয়ে গেল। মেকআপ রুমে গিয়ে আবার সব খুলে রেখে আসলাম। বের হওয়ার পর আমাকে ১০ টাকা দেয়া হলো। সেটাই বলতে গেলে আমার সিনেমায় অভিনয়ের প্রথম ইনকাম।
