ইরফানের নিয়ন্ত্রণে চলতো চাঁদাবাজি: টর্চার সেলে মিললো হাড়, দড়ি ও হ্যান্ডকাফ

নজর২৪ ডেস্ক- আলিশান বাড়ি। যেন এক রাজপ্রাসাদ। এই বাড়িকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে সংসদ সদস্য হাজী সেলিমের ছেলে ইরফান সেলিমের অপরাধ জগত। এখান থেকেই নিয়ন্ত্রণ হতো পুরান ঢাকা। চলতো চাঁদাবাজি-সন্ত্রাসী। আর এজন্য গড়ে তোলা হয় শক্তিশালী এক ওয়ারলেস নেটওয়ার্ক। র‌্যাবের অভিযানে বেড়িয়ে এসেছে এসব তথ্য।

 

ইরফান ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হাজী সেলিমের দ্বিতীয় ছেলে। এছাড়া তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর। আর নোয়াখালীর এক এমপির জামাতা।

 

সোমবার বেলা সাড়ে ১২টায় চকবাজারের ‘দাদা বাড়ি’ নামের সেই ভবনে শুরু হয় র‌্যাবের অভিযান। চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত। অভিযানের সময় হাজী সেলিম বাসায় ছিলেন না। অভিযানে মেলে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মদ, মদের বোতল, বিয়ার, বিপুল পরিমাণ ওয়াকিটকি, ইলেক্ট্রনিক্স ডিভাইস ও হ্যান্ডকাফ।

 

এ ছাড়া বেডরুম থেকে উদ্ধার করা হয় অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। একটি গুলিসহ পিস্তল, আরেকটি বন্দুক। এগুলোর লাইসেন্স নেই। উদ্ধার করা হয় শক্তিশালী অবৈধ ড্রোন, যেটা আমদানি করতে সিভিল এভিয়েশনের অনুমতি লাগে। অপরদিকে ইরফান সেলিমের দেহরক্ষী জাহিদের কাছে ৪০০ পিস ইয়াবা ও বিদেশি অস্ত্র পাওয়া যায়।

 

এদিকে হাজী সেলিমের মালিকানাধীন মদিনা আশিক টাওয়ার ভবনের ছাদের একটি রুম থেকে মানুষের হাড় পাওয়া গেছে। র‌্যাব দাবি করেছে, ১৬ তলা ভবনের ছাদের ওপরের এই কক্ষটি হাজী সেলিমের ছেলে ইরফান সেলিম টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহার করতো। ইরফান সেলিমকে তার সহযোগীসহ সোমবার (২৬ অক্টোবর) গ্রেফতার করেছে র‌্যাব।

 

র‌্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. ক. আশিক বিল্লাহ বলেন, আমাদের কাছে তথ্য ছিল এই কক্ষটি টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এরপর আমরা অভিযান চালিয়েছি। তিনি আরও বলন, টর্চার সেল থেকে হ্যান্ডকাফ, দড়ি, চাকুসহ আরও বিভিন্ন সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে।

 

তবে মানুষের হাড়ের বিষয়ে নিশ্চিত করে কোনও মন্তব্য করেননি কেউ। ফরেনসিক করার পর এবিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে বলে জানিয়েছে র‌্যাবের কর্মকর্তারা।

 

আশিক টাওয়ারটি ১৬ তলা ভবন। পুরান ঢাকার সবচেয়ে বড় ভবন এটি। ভবনের ১৬ তলায় হাজী সেলিম মালিকানাধীন মদিনা ডেভেলাপারের অফিস। এর ওপরেই ছাদে টর্চার সেল।

 

ভবনের নিরাপত্তাকর্মী আব্দুল খালেক গণমাধ্যমকে বলেন, মদিনা ডেভেলাপারে হাজী সেলিম নিজেও অফিস করেন। তার ছেলে ইরফান সেলিমও মাঝেমাঝে আসেন। তারা ছাদেও যান। তবে টর্চার সেলের বিষয়ে কোনও কিছু জানেন না বলে জানান তিনি।

 

সুউচ্চ আশিক টাওয়ারে মদিনা ডেভেলাপরের অফিসে কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে সোমবার রাতেও দেখা গেছে। তারা জানিয়েছেন, হাজী সেলিম ও ইরফান সেলিম দুজনই এই অফিসে আসেন। তবে তারা টর্চার সেলের বিষয়ে কিছু বলতে পারেনি।

 

এর আগে সন্ধ্যায় র‌্যাবের মুখপাত্র লে. ক. আশিক বিল্লাহ সাংবাদিকদের জানান, ইরফান সেলিমের বাসা থেকে পাঁচ-ছয় লিটার বিদেশি মদ, ১০ বোতল বিদেশি বিয়ার, ৩৮ থেকে ৪০টি ওয়াকিটকি উদ্ধার করা হয়। ওয়াকিটকির মাধ্যমে এক শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন ইরফান সেলিম। এর মাধ্যমে তিনি এলাকা নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজি করতেন। সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাতেন। এসব ওয়াকিটকি মূলত আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবহার করে থাকে।

 

তিনি বলেন, সংসদ সদস্য হাজী সেলিমের বাড়ির পাশে চকবাজারে আরও একটি টর্চার সেলের সন্ধান পেয়েছে র‌্যাব। এসময় আশিক বিল্লাহ বলেন, হাজী সেলিমের ছেলে কাউন্সিলর ইরফান সেলিম এবং তার সহযোগী জাহিদুল ইসলামকে এক বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

 

মাদক ও অবৈধভাবে ওয়াকিটকি রাখার অপরাধে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত তাদের দুজনকে একবছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন। হাজী সেলিমের বাড়ি থেকে উদ্ধার অস্ত্র ও মাদকের ঘটনায় র‌্যাব বাদী হয়ে দুটি মামলা করবে বলে জানিয়েছেন আশিক বিল্লাহ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *