বেতন না দিয়ে কর্মী ছাঁটাই : এবার মুখ খুললেন ইভ্যালির এমডি

নজর২৪ ডেস্ক- বিতর্কিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালি তাদের কর্মীদের জোরপূর্বক চাকরি ছাড়তে বাধ্য করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ইভ্যালির সাবেক ও বর্তমান কর্মীদের কয়েকজন প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে এই অভিযোগ তুলেছেন।

 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি তিন মাস ধরে পেছনের সারির কর্মীদের বেতন দেয়নি। যমুনা গ্রুপ ইভ্যালিতে বিনিয়োগ করবে না—এমন খবর বের হওয়ার পর কর্মীদের ছাঁটাই করার প্রবণতা চলছে।

 

ইভ্যালির এক কর্মী গণমাধ্যমকে জানান, শেষ খবর (আপডেট) পাওয়া পর্যন্ত কম্পানিটিতে এক হাজার ৮০০ জন কর্মী কাজ করতেন। তবে বর্তমানে কতজন কাজ করছেন সেটি তাঁর জানা নেই। প্রতিষ্ঠানটির একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ইভ্যালি চায় তাদের কর্মীরা নিজ থেকেই পদত্যাগপত্র দিক।

 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইভ্যালির এক কর্মকর্তা বলেন, গত দুই মাসের বেতন তিনি পাননি। বিনা বেতনে কাজ করছেন। এ মাসেরটা না পেলে তিন মাসের বেতন বকেয়া হবে। কম্পানির বেতন দেওয়ার মতো সামর্থ্য না থাকায় এর মধ্যেই কর্মী ছাঁটাই শুরু করছে। এ ব্যাপারে তিনি শঙ্কিত।

 

কোম্পানিটির কলসেন্টারে কাজ করা কয়েকজন কর্মী বলেছেন, তাদের বলা হয়েছে চলতি আগস্ট ও আগামী সেপ্টেম্বর মাসে তাদের বেতন হবে না। যার টাকার দরকার তাকে চাকরি খুঁজে নিতে বলা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটির অধিকাংশ কর্মীর মনোবল ভেঙে পড়েছে।

 

এদিকে কর্মীদের চাকরি খুঁজতে বলার কথা স্বীকার করেছেন ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ইভ্যালির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাসেলও। তিনি তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন পরিচালন ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে কিছু কর্মীদের অন্যত্র চাকরি খোঁজার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

 

তবে গণমাধ্যমে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত সংবাদের সমালোচনাও করেছেন তিনি। তিনি লিখেছেন ‘অথচ, সত্য নিউজ এমন হতে পারতো, পরিচালন ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে কিছু কর্মীদের অন্যত্র চাকরি খোঁজার পরামর্শ।’

 

তিনি আরও লিখেন, ‘আমরা গ্রাহক সাপ্লায়ারসহ সবার কাছে সময় চেয়েছি যেন বিনিয়োগ সংগ্রহ করে ইভ্যালির পূর্ণ শক্তি ফেরত আনতে পারি। এই সময় বেতন পেতে বিলম্ব হতে পারে সেই শুরুতেই কর্মীদের বলা ছিল। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি সকল প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে।’

 

প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর দুই থেকে তিন মাসের আগাম সময় নিয়ে প্রায় অর্ধেক মূল্যে পণ্য সরবরাহের লোভনীয় বিভিন্ন ‘অফার’ দেওয়া শুরু করে ইভ্যালি। তাতে অল্প সময়ের মধ্যে সারাদেশে মোটরসাইকেল, ফ্রিজ, এসি, প্রাইভেটকারসহ নানা পণ্যের ক্রেতাদের সমারোহ ঘটেছিল ইভ্যালিতে।

 

স্বল্প মূল্যের এসব পণ্যের জন্য টাকা নেওয়া হতো অগ্রিম। কিন্তু কিছু ক্রেতাকে পণ্য দিয়ে বাকিদেরকে অপেক্ষায় রাখার কৌশল নিয়ে তারা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছিল। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত করলে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। এরপর মন্ত্রণালয় ইভ্যালির বিষয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে শুরু করে।

 

এদিকে বৃহস্পতিবার(২৬ আগস্ট) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ইভ্যালির পক্ষ থেকে জমা দেওয়া দায়-দেনার হিসাবে দেখা যায়, দুই লাখ ১৪ হাজার গ্রাহক ইভ্যালির কাছে পণ্য কেনার জন্য বুকিং দিয়েছেন। গত ১৫ জুলাই পর্যন্ত বুকিং বাবদ গ্রাহকরা ইভ্যালির কাছে ৩১০ কোটি টাকা পাবেন।

 

সূত্র বলছে, দুই লাখ ১৪ হাজার গ্রাহকের মধ্যে অধিকাংশই তাদের মূল টাকা ফেরত নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

 

তবে ইভ্যালির কল সেন্টার থেকে গ্রাহকদের বলা হচ্ছিল, অচিরেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু দিন যত যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটির সংকট আরও বাড়ছে। সর্বশেষ ইভ্যালির এমডি ও চেয়ারম্যানের ব্যাংক হিসাব তলবের পর যমুনা গ্রুপও প্রতিশ্রুত বিনিয়োগ থেকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। যমুনা গ্রুপ আনুষ্ঠানিকভাবে ইভ্যালির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা না দিলেও আপাতত প্রতিষ্ঠানটিতে বিনিয়োগ করবে না। এমন পরিস্থিতিতে ইভ্যালির অধিকাংশ কর্মী চাকরি খুঁজতে শুরু করেছেন। অবশ্য অধিকাংশ কর্মী ঈদের আগে বেতন বোনাস কিছুই পাননি। ঈদের পরেও তাদের বেতন হয়নি।

 

ইভ্যালির কল সেন্টারে চাকরি করা একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, একদিকে বেতন নেই, অন্যদিকে মানুষের সঙ্গে অনবরত মিথ্যা কথা বলতে হয়। প্রতিদিন একশ কল ধরলে তার ৯৯টি কলেই গ্রাহকদের টাকা ফেরত পাওয়ার অনিশ্চয়তা ও কান্নাকাটি শুনতে হয়েছে।

 

কল সেন্টারের সবার প্রায় একই বক্তব্য- আমরা গ্রাহকদের অনবরত একই কথা বলে গেছি- আপনার পণ্যটি নিয়ে কাজ হচ্ছে, অচিরেই পেয়ে যাবেন। অনেকে অনবরত এই ধরনের মিথ্যা কথা থেকে বিরত থাকতে চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন।

 

এদিকে যেসব কর্মীর বাসায় ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ ছিল গত সপ্তাহে তাদের কাছ থেকে সেগুলো বুঝে নিয়েছে ইভ্যালি। ১৮০ জনের মতো কর্মী ছিল ইভ্যালির কাস্টমার সার্ভিস বিভাগে। তাদের সবাইকে চাকরিতে আর না যেতে বলা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *