পরীমনির সঙ্গে ‘ঘনিষ্ঠতা’: সর্বোচ্চ সাজা হতে পারে ডিবি কর্মকর্তার

নজর২৪ ডেস্ক- বিতর্কিত ও আলোচিত চিত্রনায়িকা শামসুন্নাহার স্মৃতি ওরফে স্মৃতিমনি ওরফে পরী মনির সঙ্গে পুলিশ কর্মকর্তা গোলাম সাকলায়েন শিথিলের অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়েছে। এই পুলিশ কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার গুলশান অঞ্চলের অতিরিক্ত উপকমিশনারের (এডিসি) দায়িত্বে ছিলেন।

 

আশুলিয়ার বোট ক্লাবকাণ্ডে সাভার মডেল থানায় পরীমনির করা মামলার তদারকি কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা সাকলায়েন তদন্তে সহায়তার নামে এই চিত্রনায়িকার সঙ্গে সম্পকে জড়িয়েছেন। এই ঘটনায় বিব্রত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

 

সমালোচনার মুখে গতকাল শনিবার ডিএমপির এডিসি গোলাম সাকলায়েন শিথিলকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এছাড়া পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে শুরু হয়েছে বিভাগীয় তদন্ত। গঠন করা হচ্ছে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি। যার দায়িত্বে আছেন ডিএমপির একজন অতিরিক্ত কমিশনার।

 

তদন্ত কমিটি সত্যতা প্রমাণ করতে পারলে তার সর্বোচ্চ সাজা চাকরিচ্যুতি হতে পারে বলে জানিয়েছেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফাওজিয়া করিম ফিরোজ।

 

বুধবার বনানীর বাসা থেকে পরীমনিকে আটক করেছে র‍্যাব। পরে তার নামে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দুটি মামলা হয়েছে। র‍্যাব বলছে, পরীমনির বাসা থেকে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার পরীমনিকে হেফাজতে রেখে চার দিন জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি পেয়েছে পুলিশ।

 

গোলাম সাকলায়েনের বিরুদ্ধে পরীমনির সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগ প্রমাণিত হলে পুলিশের আইনে কী সাজা হতে পারে, জানতে চাইলে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘তার (গোলাম সাকলায়েন) বিরুদ্ধে সত্যতা প্রমাণ হলে সর্বোচ্চ সাজা চাকরি চলে যেতে পারে। চাকরি থেকে তাকে বের করে দিতে পারে।’

 

একই বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফাওজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, ‘এটা একটা বড় মিস কন্ডাক্ট। এতে রীতিমতো ওনার চাকরি চলে যেতে পারে। এ ছাড়া দুই-তিন বছর তার ইনক্রিমেন্ট বন্ধ হতে পারে। এ ছাড়া প্রোমোশন বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

 

‘পুলিশের চাকরি এমন একটা চাকরি, যে চাকরিতে অনেক অঙ্গীকার থাকে। যদি তদন্তে প্রমাণিত হয়, তবে এই অঙ্গীকার খর্ব করেছেন আপনি। আপনি অঙ্গীকারের বাইরে যাচ্ছেন। এ বিষয়ের একটা সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত।’

 

মামলা চলার সময় বাদী বা বিবাদীকে বাসায় আনা যাবে কি না, জানতে চাইলে ফাওজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, ‘না, বাসায় আনা যাবে না। এটা বিরাট একটা অফেন্স। আপনি একজন অফিসারকে দায়িত্ব দিলেন। তিনি দায়িত্বে অবহেলা করে যদি টাকাপয়সা, ফিজিক্যাল বা ভালোবাসার কাছে বিক্রি হয়ে যান, এটা তো ঠিক না।’

 

জানা যায়, গোলাম সাকলায়েন শিথিল একজন মেধাবী অফিসার। তার স্ত্রী নারায়ণগঞ্জের একটি উপজেলার নির্বাহী অফিসারের দায়িত্বে রয়েছেন। তাদের একটি সন্তানও রয়েছে।

 

প্রাপ্ত তথ্য মতে, সাকলায়েনের বাসায় নায়িকা পরীমনির যাতায়াতের সিসিটিভির ভিডিও ফুটেজ ভাইরাল হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, গত ১ আগস্ট সকাল সোয়া ৮টায় পরীমনির সাদা রংয়ের হ্যারিয়ার গাড়িটি (ঢাকা মেট্রো-ঘ ১৫ ৯৬ ৫৩) নিয়ে গোলাম সাকলায়েনের রাজারবাগের অফিসার্স কলোনির মধুমতি ভবনের ৯/সি নম্বর সরকারি ফ্ল্যাটে আসেন। প্রথমে সেই গাড়ি থেকে লাল রংয়ের টি-শার্ট পরে বের হন সাকলায়েন। সাদা রংয়ের একটি স্লিপিং গাউন পরে নামেন নায়িকা পরীমনি। প্রায় ১৮ ঘন্টা পর সেই রাতে সোয়া ২টায় ওই ভবন থেকে বের হন পরীমনি।

 

তবে রাতে বের হওয়ার সময় পরীমনির পরনে ছিল কালো রংয়ের পোশাক, আর সাকলায়েনের গায়ে সাদা টি-শার্ট। সম্প্রতি ডিবিতে জিজ্ঞাসাবাদেও পরীমনি সাকলায়েনের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের কথা স্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে। এছাড়া জিজ্ঞাসাবাদে পরীমনির সহযোগী আশরাফুল ইসলাম দীপুও এ সম্পর্কে বিস্তারিত বলেন।

 

ডিবির একটি দায়িত্বশীল সূত্রে জানা যায়, বোট ক্লাবের মামলা তদন্তের সময় সাকলায়েন নিজেকে অবিবাহিত দাবি করেন। তদন্তকাজে যোগাযোগ পরে প্রেমে পরিণত হয়। কিন্তু সাকলায়েন বিবাহিত, বিষয়টি জানার পর পরী মনি ও তার মধ্যে মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়। পরে র‌্যাবের অভিযানে পরী মনির সঙ্গে গ্রেপ্তার তার সহযোগী দীপুর উদ্যোগে দুজনের সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়। গত কুরবানির ঈদের সময় পরী মনির বাসায় তিন দিন ছিলেন সাকলায়েন। তখন বাসায় তারা ছাড়া আর কেউ ছিল না।

 

এ বিষয়ে পরীমনির গাড়িচালক নাজির হোসেন বলেন, রাজারবাগ পুলিশ কোয়ার্টারে পরী মনিকে গত ১ আগস্ট সকালে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। আবার রাতে পরী মনির ফোন পেয়ে তাকে আনতে যান। এছাড়া তারা দুজনই গাড়ি চালাতে পারেন। তারা মাঝেমধ্যেই আমাকে রেখে নিজেরা ড্রাইভ করে হাতিরঝিলে ঘুরতে যেত। গাড়ি চালানো অবস্থায় তারা কোনো কথা বলতেন না। তবে গাড়িতে মদ্যপান করতেন। আবার মাঝেমধ্যে তারা একা গাড়ি নিয়ে বের হতেন।

 

গোলাম সাকলায়েন শিথিল ৩০তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে প্রথম স্থান লাভ করেন। রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার মোক্তারপুর গ্রামের পদ্মার পাড়ে তার জন্ম। অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পাওয়া সাকলায়েন ২০০১ সালে সারদা গভ. পাইলট একাডেমি হাই স্কুল থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পাস করেন। এইচএসসি পাসের পর আর্মিতে কমিশন পদে পরীক্ষায় অংশ নেন। সব ধাপ সফলতার সঙ্গে অতিক্রম করে যোগ দেন আইএসএসবি-৫৯ লং কোর্সে মিলিটারি একাডেমিতে।

 

কিন্তু পরে সেখান থেকে চলে আসেন তিনি। প্রস্তুতি নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হন তিনি। পড়াশোনা শেষে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের চাকরির পরীক্ষায় প্রথম হন। একই সঙ্গে পরীক্ষা দিয়ে সফল হন সহকারী উপজেলা অফিসারে। পোস্টিং হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জে। সেখানে সহকারী উপজেলা অফিসার থাকা অবস্থায়ই দেন ৩০তম বিসিএস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *