সাইফুল ইসলাম মুকুল, রংপুর ব্যুরো: বিভাগীয় নগরী রংপুরের ১০টি স্থানে বুধবার থেকে চরম অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে সাশ্রয়ী মূল্যে টিসিবি পণ্য বিক্রি হয়েছে। সকাল ১০টায় পণ্য বিক্রি শুরু হওয়ার কথা থাকলেও দেড় ঘণ্টা পর বেলা সাড়ে ১১টায় বিক্রয় শুরু হয়েছে।
এদিকে টিসিবি পণ্য বিক্রি করার জন্য ওয়ার্ড ভিত্তিক তালিকা তৈরি ও কার্ড প্রদান করা নিয়ে চরম অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে জনপ্রতিনিধির উপর।
সহায় সম্বলহীন দুস্থ পরিবারের বেশিরভাগ পরিবার কার্ড পায়নি। পেয়েছে অবস্থাপন্ন সচ্ছল ও জনপ্রতিনিধিদের স্বজনদের পরিবারগুলো। এখানেই শেষ নয় অনেক পরিবারে ৩/৪টি করেও কার্ড দেয়া হয়েছে।
সরেজমিন রংপুর নগরীর ২২নম্বর ওয়ার্ডের কামারপাড়া টিসিবি পণ্য বিক্রয় কেন্দ্র ঘুরে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। সকাল ১০টায় নগরীর কামারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা গেছে নারী ও পুরুষদের আলাদা দুটি লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে টিসিবি পণ্য দেয়ার জন্য। কিন্তু রংপুর সিটি করপোরেশনের ২২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মিজানুর রহমান মিজু বেলা ১১টা পর্যন্ত সেখানে না আসায় পণ্য বিক্রি শুরু করেনি সংশ্লিষ্ট ডিলার।
বেলা সোয়া ১১টায় ওয়ার্ড কাউন্সিলর মিজু সেখানে এসে পুরুষদের জন্য নির্ধারিত লাইনের সামনে দাঁড়ানো ট্রাকের সামনে ডিলার পণ্য বিক্রি শুরু করলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং বলেন তার আসার আগে কেন বিক্রি শুরু করা হলো। পরে ডিলার বাধ্য হয়ে বিক্রি বন্ধ করে দিলেন। এরপর কাউন্সিলর মিজু নারীদের লাইনের সামনে দাঁড়ানো একইভাবে ধমক দিয়ে তার আসার আগে বিক্রি শুরু করার কৈফিয়ত চাইলেন। পরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করায় বেলা সাড়ে ১১টার পর টিসিবির পণ্য বিক্রি তার উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়।
পুরুষদের লাইনে দাঁড়ানো ব্যক্তিদের বেশিরভাগই অবস্থাপন্ন পরিবারের লোকজন বলে অভিযোগ করলেন সাইফুল ইসলাম নামে একজন নির্মাণ শ্রমিক। তিনি অভিযোগ করলেন এখানে প্রায় দুই হাজার মানুষকে কার্ড দেয়া হয়েছে তাদের বেশির ভাগই অবস্থাপন্ন এবং সচ্ছল তাদের কার্ড পাওয়ার কোন কথা নেই অথচ আমার মতো দিন আনা দিন খাওয়া মানুষ কার্ড পায়নি।
তিনি আরও অভিযোগ করলেন, অনেক বাড়িতে ২/৩টি করেও কার্ড দেয়া হয়েছ। কাউন্সিলর পছন্দের ব্যক্তিদের অর্থের বিনিময়ে কার্ড দিয়েছে বলে অভিযোগ করেন।
একই অভিযোগ করলেন ওই এলাকার আফজাল নামে এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, যারা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে কার্ড নিয়ে টিসিবি পণ্য নেয়ার কার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তাদের বেশির ভাগ সচ্ছল এরা কিভাবে কার্ড পায়? অথচ এলাকার সত্যিকার সহায়সম্বলহীন অসহায় পরিবারগুলোর বেশির ভাগই কার্ড পায়নি।
একইভাবে নারীদের লাইনে দাঁড়ানো বেশ কয়েকজন কার্ডধারীকে জিজ্ঞাসা করে জানা গেল, তাদের পাকা বাড়ি আছে অবস্থাপন্ন, তারা তারপরও টিসিবি পণ্যের কার্ড পেয়েছেন কাউন্সিলর দিয়েছেন বলে। তারা কেউই নাম বলতে রাজি হননি। এভাবে অনেক সচ্ছল পরিবার কার্ড নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে পণ্য কিনেছেন।
অন্যদিকে সহায়সম্বলহীন অনেক অসহায় নারীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে, যাদের বেশির ভাগ কার্ড পায়নি। আকলিমা বেগম জানান, তার স্বামী তাকে ছেড়ে চলে গেছে। দুই সন্তান নিয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটছে।
তিনি জানান, মানুষের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে সংসার চলে অথচ অনেক বার ধর্ণা দিয়েও কার্ড জোটেনি তার। কাউন্সিলর বলেছেন পরে দেবে। কিন্তু পরে আর তো কার্ড পাওয়ার সুযোগ নেই।
একই কথা জানালেন সালেহা বেগম, মনি বেগম, লাইলি বেগমসহ অনেকেই। তাদের সবার অভিযোগ, তারা কার্ড পাননি অথচ যারা সচ্ছল টাকা পয়সার অভাব নেই তারা কার্ড পেয়েছেন।
এ ব্যাপারে রংপুর সিটি করপোরেশনের ২২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মিজানুর রহমান মিজু স্বীকার করেন, অনেককে কার্ড দেয়া সম্ভব হয়নি। তিনি জানান, তার ওয়ার্ডের ৩টি স্থানে সাড়ে তিন হাজার নারী-পুরুষকে টিসিবি পণ্য দেয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, তার ওয়ার্ডে ৫ হাজার পরিবার আছে যাদের কার্ড পাওয়া উচিত কিন্তু সেই পরিমাণ কার্ড না পাওয়ায় দেয়া সম্ভব হয়নি। অনেক হতদরিদ্র পরিবারকে কার্ড দেয়া হয়নি অথচ অনেক সচ্ছল পরিবার কার্ড পেয়েছে এমন প্রশ্নের কোন সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি।





