ঢাকা    ৭ই ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ



র‍্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে ‘সবকিছু ফাঁস’ করে দিলেন পরীমণি নিজেই

প্রকাশিত: ১২:১৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৬, ২০২১

র‍্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে ‘সবকিছু ফাঁস’ করে দিলেন পরীমণি নিজেই

নজর২৪ ডেস্ক- শৈশবে মা-বাবাকে হারানোর পর গ্রামের কিশোরী শামসুন নাহার স্মৃতি থেকে রূপালী পর্দায় ‘পরীমণি’ হয়ে উঠা এই চিত্রনায়িকা পদস্খলনের জন্য দায়ী করেছেন তার পারিপার্শ্বিকতাকে।

 

জানা যায়, ‘বিশেষ সঙ্গ’ ও বিভিন্ন পার্টিতে অংশ নিয়ে অর্থ আয় করতেন চিত্রনায়িকা পরীমণি। তার এই কাজে সহযোগিতা করতো কথিত প্রযোজক নজরুল ইসলাম রাজ। রাজই প্রথমে পরীমণিকে কোটিপতি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বিশেষ উদ্দেশ্যে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। রাজের সঙ্গে মিশু হাসান ও জিসান মিলে ১০ থেকে ১২ জন তরুণী নিয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। তাদের কাজই ছিল উচ্চবিত্ত ও বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের ‘বিশেষ সঙ্গ’ দেওয়া।

 

এর বিনিময়ে তারা অর্থ আয় করতেন। এই চক্রের তরুণীদের মধ্যে পরীমণির ‘চাহিদা’ ছিল সবচেয়ে বেশি। পরীমণি দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশেও ‘প্লেজার ট্রিপ’ দিতেন।

 

গ্রেফতার হওয়ার পর র‌্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য জানিয়েছে পরীমণি নিজেই।

 

আরও পড়ুন-

সাড়ে ৩ কোটি টাকার গাড়ির উপহার, বিনিময়ে তার সঙ্গে দুবাই ভ্রমণে যান পরীমনি

ব্যাংকে পরীমনির টাকার পাহাড়, আয় বাড়াতে নাম লেখান প.র্নো.গ্রাফির নিষিদ্ধ জগতে

 

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, পরীমণির বাসায় একটা মিনি বার রয়েছে। তিনি বাসায় মাঝে মধ্যেই পার্টির আয়োজন করতেন। এখানে বিভিন্ন ব্যক্তিরা আসতেন। তার এই কাজে সহযোগিতা করতেন নজরুল ইসলাম রাজ। এই সিন্ডিকেটের সদস্যদের বিষয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান চলতো।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পরীমণি ২০১৪ সালে শোবিজ মিডিয়ায় যুক্ত হন। গত সাত বছরে তিনি ৩০টির মতো সিনেমায় অভিনয় করেছেন। এর মধ্যেই তিনি কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। চলচ্চিত্রে অভিনয়ের চেয়ে নিয়মিত বিভিন্ন পার্টিতে অংশ নেওয়ার নেশা ছিল তার। এছাড়া চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশের পর থেকেই মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন তিনি। নিয়মিত বিভিন্ন পার্টিতে গিয়ে মদ পান করতেন। এসব পার্টিতে শিল্পতিদের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র ধরে সখ্যতা গড়ে তুলতেন। এরপর দেশের বাইরে বিশেষ করে দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে শিল্পপতিদের ‘এসকর্ট’ হিসেবেও কাজ করতেন।

 

জিজ্ঞাসাবাদে পরীমণি জানিয়েছে, তার ব্যবহৃত গাড়িটি একটি বেসরকারি ব্যাংকের উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা কিনে দিয়েছিলেন। ওই কর্মকর্তার সঙ্গে তার বিশেষ সখ্যতা রয়েছে। করোনার মধ্যেই ওই ব্যক্তির সঙ্গে দুবাই ভ্রমণে যান তিনি। এছাড়া বিদেশে বসবাসকারী বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে পরীমণিকে যোগসূত্র ঘটিয়ে দেওয়ার কাজ করিয়ে দিতেন তুহিন সিদ্দিকী অমি।

 

র‌্যাবের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, গ্রেফতারের পর পরীমণির মোবাইল ফোনটি তারা পরীক্ষা করে দেখেছেন। সেখানে অনেক ভিআইপি ব্যক্তি ও শিল্পপতিদের সঙ্গে তার যোগাযোগ ও বিশেষ সম্পর্ক থাকার অনেক তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। অনেকের সঙ্গে তার নিয়মিত কথপোকথনের প্রমাণও পাওয়া গেছে। এসব ব্যক্তিরা সমাজের উঁচুস্তরের ব্যক্তিবর্গ। তাদের বিষয়েও খোঁজ-খবর করা হচ্ছে বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

 

মাস খানেক আগে ঢাকা বোটক্লাবে গিয়ে নাসির উদ্দিন মাহমুদ নামে এক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ করে আলোচনায় আসেন নায়িকা পরীমণি। পরে পুলিশের তদন্তে উঠে আসে, বোটক্লাবে পরীমণি মদ্যপান করে নিজেই উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করেছিলেন। এই ঘটনা ছাড়াও পরীমণির বিরুদ্ধে বিভিন্ন ক্লাবে গিয়ে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করার অনেক অভিযোগ আসে। শোবিজ সম্পর্কিত অনেকেই বলছেন, চলচ্চিত্রে ভালো অভিনয় করে আলোচনায় আসার চেয়ে ‘উল্টা-পাল্টা নানান ঘটনা’ ঘটিয়ে আলোচনায় থাকতে চাইতেন এই নায়িকা।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পরীমণির সঙ্গে অনেক ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি ছাড়াও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া অনেক রাজনীতিকের সঙ্গেও যোগাযোগ ছিল তার। আন্ডারওয়ার্ল্ডের অনেক সন্ত্রাসীর সঙ্গেও অর্থের বিনিময়ে ‘বিশেষ সঙ্গ’ দিয়ে অর্থ আয় করেছেন তিনি। একটি সূত্র জানায়, প্রবীণ এক রাজনীতিকের বাসায় নিয়মিত যাতায়াত করতেন তিনি। কথিত প্রযোজক নজরুল রাজ তাকে ওই রাজনীতিকের বাসায় নিয়ে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।

 

র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল কে এম আজাদ বলেন, পরীমণি ও রাজের বিষয়ে আমরা অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছি। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে। যাচাই-বাছাই শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

 

গতকাল বিকেলে পরীমণিকে বনানী থানায় হস্তান্তর করে র‌্যাব। বুধবার আটকের পর অভিনেত্রী যে পোশাকে ছিলেন, গতকালও তাকে একই পোশাকে দেখা গেছে।

 

গত বুধবার র‌্যাবের মাদকবিরোধী অভিযানে গ্রেপ্তার হন পরী। একদিন র‌্যাবের হেফাজতে থাকার পর বৃহস্পতিবার বিকালে তাকে বনানী থানায় সোপর্দ করা হয়। রাত সোয়া ৮টার দিকে চিত্রনায়িকা পরীমণিকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে নেওয়া হয়। তার সঙ্গে আদালতে হাজির করা হয় তার সহযোগী দীপু, ‘বন্ধু’ প্রযোজক রাজ ও রাজের ম্যানেজার সবুজকে।

 

আদালতে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন বনানী থানার পরিদর্শক সোহেল রানা।

 

পরীমণির পক্ষে তার আইনজীবীরা রিমান্ড বাতিল করে জামিনের আবেদন জানালেও তা নাকচ করে দেন ঢাকার মহানগর হাকিম মো. মামুনুর রশিদ। পরীমণিকে চার দিনের রিমান্ড আদেশ দেন তিনি।

 

একই মামলার আসামি পরীমণির সহযোগী আশরাফুল ইসলাম দীপু এবং বুধবার র‌্যাবের আলাদা অভিযানে গ্রেপ্তার নজরুল ইসলাম রাজ ও তার ব্যবস্থাপক সবুজ আলীকেও বনানী থানার মাদকের আলাদা মামলায় চার দিনের হেফাজতে দিয়েছেন বিচারক।

 

আদালতে তোলার সময়ও খুব স্বাভাবিক ছিলেন পরীমণি। আদালত প্রাঙ্গণে তাকে হাসিখুশি দেখা যায়। এরপর শুনানির শুরু থেকেই পরীমণি আদালতে নিশ্চুপ ছিলেন।

 

এর আগে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় চিত্রনায়িকা পরীমণির বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে রাজধানীর বনানী থানায় মামলা দায়ের করেছে র‌্যাব।

 

আরও পড়ুন-

‘পরীমনি মদ খান না, বাসায় বোতল রেখেছিল শখের বশে’

 

নজর২৪ ডেস্ক- ২০১৬ সাল থেকে মদের প্রতি আসক্ত হলেও পরীমনি দাবি করেছেন, তিনি কখনো মদ খাননি। এমনকি তিনি তার আইনজীবীকে জানিয়েছেন, তার বাসায় কোনো মদ ছিলো না। অভিনেত্রীর দাবি, তিনি শখের বশে মদের খালি বোতল সংগ্রহ করতেন।

 

বৃহস্পতিবার (৫ আগস্ট) সংশ্লিষ্ট সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

 

 

এদিকে আজ প্রেস ব্রিফিংয়ে র‍্যাব জানায়, ভয়ংকর মাদক এলএসডি ও আইস সেবন করতেন পরীমনি। তাছাড়া মদে মাত্রাতিরিক্তি আসক্তি তার। নিজ বাসায় একটি মিনিবারও রয়েছে তার।

 

চলচ্চিত্র প্রযোজক নজরুল ইসলাম রাজ পরীমনির বাসায় এসব মাদক সরবরাহ করতেন। মিনিবার থাকায় তার বাসায় পার্টির আয়োজন করা হতো। সেই পার্টিতে বিভিন্ন প্রকার মাদক সরবরাহ করতেন রাজ।

 

জিজ্ঞাসাবাদে পরীমনিও জানিয়েছেন, ২০১৬ সাল থেকেই তিনি মদের প্রতি আসক্ত হয়ে গেছেন। এরপর অন্য মাদকও গ্রহণ করতেন। কিন্তু সন্ধ্যায় আদালতে আসার আগে আইনজীবীকে ভিন্ন কথা বলেন সময়ের আলোচিত এই অভিনেত্রী।

 

এদিকে চিত্রনায়িকা পরীমণির বাসা থেকে উদ্ধারকৃত মদের বোতলগুলো ছিল খালি, ভরা বোতল তার বাসা থেকে পাওয়া যায়নি, দাবি করেছেন পরীমণির আইনজীবী নীলাঞ্জনা রেফাত সুরভী।

 

বনানী থানায় করার মাদকের মামলার শুনানি শেষে রাতে পরীমণির আইনজীবী নীলাঞ্জনা রেফাত সুরভী আরও বলে, ‘তার (পরীমণির) বাসা থেকে যে সাড়ে ১৮ লিটার মদ উদ্ধার দেখানো হয়েছে, তা তার বাসায় ছিল না। তার বাসায় কয়েকটি খালি মদের বোতল ছিল। সেগুলো ডেকোরেশন পিস হিসেবে রাখা ছিল। এগুলো জব্দ তালিকায় দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, তার কাছে কোনো আইস এবং এলএসডি ছিল না। আমরা তার জামিন চাই।’

 

আইনজীবী আদালতকে বলেন, ‘এ মামলায় পরীমণিকে হয়রানির কারন পেছনের একটি দ্বন্দ্ব (নাসিরের বিরুদ্ধে মামলা)। তার মানসম্মান নষ্টের জন্যেই এ মামলা। স্বনামধন্য একজন নায়িকার মানসম্মান যাতে ক্ষুণ্ন না হয় সেজন্য রিমান্ড নামঞ্জুর করা প্রয়োজন। তাকে জামিন দেওয়া উচিত।’

 

ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রশিদের আদালত শুনানি শেষে পরীমণির চারদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পাশাপাশি তার সহযোগী আশরাফুল ইসলাম দীপুরও চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

 

রাত ৮টা ২৫ মিনিটে ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পরীমণি ও আশরাফুল ইসলাম দীপুকে হাজির করা হয়। পরে তাদের আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়।

 

আরও পড়ুন-

ফুটবলারের স্ত্রী শামসুন্নাহার থেকে আজকের পরীমনি: উত্থান ও পতনের গল্প