Home ফিচার বাংলাদেশের সিদ্ধান্তে কষ্ট পেয়েছি, হতাশ হয়েছি: একান্ত সাক্ষাৎকারে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত

বাংলাদেশের সিদ্ধান্তে কষ্ট পেয়েছি, হতাশ হয়েছি: একান্ত সাক্ষাৎকারে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত

0
115

নজর২৪ ডেস্ক- ইসরাইল ব্যতীত বিশ্বের সব দেশের ক্ষেত্রে বৈধ’- বাংলাদেশের পাসপোর্টে এই লেখাটি থেকে ‘ইসরাইল ব্যতীত’- কথাটি বাদ পড়ার খবর সমপ্রতি গণমাধ্যমে আসে। এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে ইসরাইলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের উপ-মহাপরিচালক গিলাদ কোহেন বাংলাদেশ সরকারকে ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের আহ্বান জানালে সচেতন মহল নড়েচড়ে বসে।

 

পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন অবশ্য গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এই পরিবর্তনে ইসরাইলের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক পরিবর্তনের কিছু নেই। কারণ, আমরা ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিই না।’

 

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেও এক বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের ইসরাইল ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রয়েছে এবং ইসরাইলের প্রতি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অবস্থানের বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি।

 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও জানান, পাসপোর্টের ‘আন্তর্জাতিক মান’ রাখতে গিয়েই ওই পরিবর্তন আনা হয়েছে, এর সঙ্গে বাংলাদেশের ইসরাইল-নীতির কোনো সম্পর্ক নেই।

 

কিন্তু গণমাধ্যমের কাছে বাংলাদেশের পাসপোর্টে পরিবর্তনের বিষয়টিকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে ঢাকায় নিযুক্ত ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত ইউসুফ সালেহ ওয়াই রামাদান আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশ সরকার পাসপোর্টের ক্ষেত্রে তার আগের অবস্থানে ফিরে যাবে।

 

‘আন্তর্জাতিক মানের’ জন্যই এ পরিবর্তন আনা হয়েছে এমন বক্তব্য নিয়ে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আপনি কি বলছেন যে গত ৫০ বছর ধরে বাংলাদেশি পাসপোর্ট আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখেনি। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার মতো দেশ যারা পাসপোর্টে ইসরাইলের ওপর নিষেধাজ্ঞা উল্লেখ করছে তাদের পাসপোর্ট কি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নয়?’

 

সবমিলিয়ে পরিস্থিতি অনেকটাই ঘোলাটে। এমন পরিস্থিতিতে’র মুখোমুখি হয়েছেন রাষ্ট্রদূত ইউসুফ সালেহ ওয়াই রামাদান:

 

গণমাধ্যম: বাংলাদেশের পাসপোর্টে পরিবর্তনের বিষয়টিকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলতে আপনি আসলে কি বুঝাতে চেয়েছেন?

 

রাষ্ট্রদূত: হ্যাঁ, আমি বিষয়টা পরিষ্কার করতে চাই। সবার এটা জানা উচিত যে বাংলাদেশ এবং ফিলিস্তিনের সম্পর্ক বেশ মজবুত। ৫০ বছর ধরেই এটা মজবুত এবং সারাজীবন সম্পর্কটা এমনই থাকবে। কেউ এই সম্পর্ক নষ্ট বা এই সম্পর্কে চিড় ধরাতে পারবে না। এই সম্পর্ক কিছু নীতির উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে আর সেকারণেই সম্পর্কটা মজবুত।

 

নতুন ই-পাসপোর্ট ইস্যু নিয়ে আমি বলবো, সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার রয়েছে যা বাংলাদেশের জনগণের লাভের কথা চিন্তা করেই গ্রহণ করা হবে। অন্যদিকে ফিলিস্তিনি হিসেবে আমি আমার জনগণের পক্ষেই বলবো। এর মানে এই নয় যে আমরা দু’দেশের মধ্যকার সম্পর্ককে নষ্ট করছি। বাংলাদেশের জনগণ যতোভাবে সম্ভব ফিলিস্তিনের পক্ষে তাদের সমর্থন দেখিয়েছে। আমরা তা প্রত্যক্ষ করেছি এবং আমরা সেটা কখনোই ভুলবো না।

 

সবসময় আমাদের তা স্মরণে থাকবে। তাই বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে এটা আমাদের একেবারেই ‘অপ্রত্যাশিত’ ছিল। আবারও বলছি এটা অপ্রত্যাশিত ছিল। সেজন্য আমি কষ্ট পেয়েছি, অবাক হয়েছি, হতাশ হয়েছি। আমি মনে করি আমাদের জনগণের অনুভূতি প্রকাশের অধিকার আমার রয়েছে।

 

বাংলাদেশিরা আমাদের ভাই, প্রকৃতই তারা আমাদের ভাই। বাংলাদেশিরা আমাদের সবসময় সমর্থন জানিয়ে এসেছে। কিন্তু পাসপোর্ট ইস্যুটি এমন একটা সময় সামনে এসেছে যা ইসরাইলকে একটি ভুল বার্তা দিয়েছে। মাত্রই সারা বিশ্বের চোখের সামনে ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের উপর চরম নৃশংসতা চালিয়েছে, নারী ও শিশুদের নির্বিচারে হত্যা করেছে। ইসরাইলিরা এটাকে একটা পুরস্কার হিসেবে নিয়েছে।

 

এটা যদিও কোনো পুরস্কার নয়, কিন্তু তারা সেটাই ধরে নিয়েছে এবং সেভাবেই এটাকে ব্যবহার করেছে। আর এটা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকেও ইসরাইলের ভেতরে আরো জনপ্রিয়তা অর্জনে সাহায্য করবে যিনি শান্তি ও স্থিতিশীলতার বিপক্ষে কাজ করছেন, ফিলিস্তিনি শিশুদের বিরুদ্ধে, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কাজ করছেন। আর এসব কারণেই আমি হতাশ হয়েছি, কষ্ট পেয়েছি, এখনও পাচ্ছি এবং কেউ এই অনুভূতি পরিবর্তন করতে পারবে না। এটাই বাস্তবতা, এটাই সত্য। আমি মনে করি বাংলাদেশের বেশিরভাগ ভাই-বোনদের অনুভূতিও আমার মতোই।

 

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ করে মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যাখ্যার বিষয়ে আমি বলবো, আমি তার বক্তব্যকে সুস্বাগত জানাই। এই ব্যাখ্যা প্রদানের জন্য তাকে আমি ধন্যবাদ জানাই। অ্যাম্বাসেডর-অ্যাট-লার্জ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিনকেও ফিলিস্তিন ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করার জন্য ধন্যবাদ জানাই। প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই ফিলিস্তিনকে সবসময় পূর্ণ সমর্থন দেয়ার জন্য। আশা করি আমি আমার অবস্থান স্পষ্ট করেছি। এটা নিয়ে আর কোন দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকবে না।

 

গণমাধ্যম: এখন বাংলাদেশের কাছ থেকে কি প্রত্যাশা করেন?

 

রাষ্ট্রদূত: বাংলাদেশ সরকারকে অনুরোধ জানাচ্ছি, সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার জন্য। সেটা ফিলিস্তিনের জনগণের জন্য একটা বড় সমর্থন হবে। আশা করি বাংলাদেশের পাসপোর্টে সবসময় ‘ইসরাইল ব্যতীত’ কথাটি উল্লেখ থাকবে। এটা ফিলিস্তিন, ইসরাইল তথা গোটা বিশ্বকে স্পষ্ট বার্তা দেবে যে, ফিলিস্তিন ইস্যুতে বাংলাদেশ অন্যান্য অনেক মুসলিম দেশগুলোর (যাদের পাসপোর্টে ‘ইসরাইল ব্যতীত’ কথাটি উল্লেখ আছে) মতো তার নীতি, তার অবস্থান ধরে রেখেছে। এটা আমার আন্তরিক অনুরোধ। আমি বিষয়টা বাংলাদেশের শীর্ষনেতৃত্বের ওপর ছেড়ে দিচ্ছি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here