নজর২৪ ডেস্ক- আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক উপ-কমিটি থেকে সদ্য পদ হারানো হেলেনা জাহাঙ্গীরের আইপি টিভি জয়যাত্রা এক অদ্ভুত নিয়মে চলত। জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগ দিয়ে তাদের বেতন তো দিতই না, উল্টো প্রতি মাসে তাদেরকেই টাকা পাঠাতে হতো অফিসে।
নিয়োগের সময়ও দিতে হতো জামানতের টাকা। আর নানা সময় নানা ত্রাণ বিতরণ, প্রতিনিধি সম্মেলন, পিকনিকসহ নানা কথা বলে নেয়া হতো টাকা।
ভোলায় জেলা প্রতিনিধি হিসেবে ২০১৮ সালে নিয়োগ পান তুহিন খন্দকার। কয়েক মাস আগে তিনি অফিসে ফোন করে জামানতের টাকা ফেরত চান। সেই ফোনালাপ ফাঁসের পর বিষয়টি সামনে আসে।
তুহিনের ফাঁস হওয়া ফোনালাপ থেকে জানা যায়, প্রতিনিধিরা লাইভ করবেন, তাদের পাঠানো সংবাদ প্রচার হবে, এই শর্তে টাকা নেয়া হতো। তিনি এক মাসে টাকা না দেয়ার পর তাকে লাইভ করতে দেয়া হয়নি। গ্রুপের ফেসবুক পেজ থেকেও রিমুভ করা হয়েছে।
হেলেনা জাহাঙ্গীর গ্রেপ্তার হওয়ার পর গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন তুহিন খন্দকার। জানান, র্যাব তাকে বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ দিতে বলেছে।
তুহিন বলেন, ‘জেলা প্রতিনিধির কাছ থেকে ৩ হাজার ও উপজেলা প্রতিনিধির কাছ থেকে ২ হাজার টাকা করে নিত। সব উপজেলায় না নিলেও জেলাগুলোতে প্রতিনিধি নিয়োগ দিয়ে টাকা নিত।’
তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন দেশে জয়যাত্রা প্রতিনিধি নিয়োগ দিয়ে তাদের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা করে নিয়েছে। জেলা প্রতিনিধি যার কাছ থেকে যা পেত তাই নিত।’
তুহিন বলেন, ‘আমার কাছ থেকে একবার ২০ হাজার ও পরে ১০ হাজার টাকা নিয়েছে। ওদের ডিমান্ট ছিল ১ লাখ ও ৫০ হাজার টাকা।’
কী জন্য টাকা নিত- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘কিছুদিনের মধ্যে আমাদের ক্যামেরা দেয়ার কথা বলে জামানতের টাকা নিত। যেহেতু ক্যামেরা দেবে, সে জন্য আমরা টাকা দিয়েছি।
‘পরে দেখা যাচ্ছে প্রতিনিধি সম্মেলনের কথা বলে ৫ হাজার টাকা করে নিয়েছে। এ ছাড়াও পিকনিকসহ একেক সময় একেক অজুহাতে টাকা নিত।
‘জয়যাত্রা ফাউন্ডেশনের কথা বলে হেলেনা জাহাঙ্গীর বিভিন্ন দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় ত্রাণ দেয়ার কথা বলে আমাদের কাছ থেকে এক হাজার টাকা করে নিয়েছে।’
এই টাকার জন্য প্রতিনিধি কো-অর্ডিনেটর ছানাউল্লাহ নূরী চাপ দিতেন বলে জানিয়েছেন আইপি টিভির একসময়ের ভোলা প্রতিনিধি। বলেন, ‘হাজেরা নামের একজন আমাদের কাছ থেকে বিকাশের মাধ্যমে টাকাগুলো কালেকশন করত।’
তিনি বলেন, ‘আমার নিয়োগপত্র আছে, আমি প্রায় আড়াই বছরের মতো ছিলাম। আমাদের ৩ মাস পর্যন্ত পরীক্ষামূলক কাজ করলে ওয়েজবোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী ভালো একটা বেতন দেবে বলছে।
‘আড়াই বছর কাজ করে মাসে ৩ হাজার টাকা করে দিয়ে আসছি এবং উপজেলা প্রতিনিধিরা ২ হাজার টাকা করে দিয়ে আসছে।’
আবুল খায়ের নামে একজন জানান, তিনি উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ পেতে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু জয়যাত্রা টাকা চাওয়ার পর আর আগাননি।
তিনি বলেন, ‘আমার কাছ থেকে ২৫ হাজার টাকা চেয়েছে। পরবর্তী সময়ে ১০ হাজার টাকা মাইনাস করে ১৫ হাজার টাকা চেয়েছে।
‘আমি জিজ্ঞাসা করলাম যে আমাদের প্রতি মাসে সম্মানী ভাতা হিসেবে কী দেবে। তারা বলেছে, উপজেলা প্রতিনিধিদের সম্মানী ভাতা দেয় না। পরে আমি আর তাদের সঙ্গে আগ্রহী হলাম না।’
উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার (২৯ জুলাই) রাত ৮টার পর হেলেনা জাহাঙ্গীরের গুলশান-২ এর ৩৬ নম্বর রোডের বাসভবনে অভিযান শুরু করে র্যাব। দীর্ঘ চার ঘণ্টা অভিযানের পর তাকে আটক করা হয় এবং তার বাসা থেকে বিপুল পরিমাণ মদ ও বন্যপ্রাণীর চামড়া জব্দ করা হয়।
গুলশান থানায় দায়ের করা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় শুক্রবার হেলেনা জাহাঙ্গীরকে আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শেখ শাহানুর আলম মামলার সুষ্ঠু তদন্তের প্রয়োজনে পাঁচ দিনের রিমান্ডের আবেদন করলে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।





