দ্রুত বড়লোক হতে ৫০০ বাইক চুরি, অবশেষে ধরা

রাজধানীর যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে অভিনব উপায়ে নকল চাবি দিয়ে মোটরসাইকেল চুরি করতো একটি চক্র। এরপর কেরানীগঞ্জ, দোহার, মুন্সিগঞ্জসহ ঢাকার পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন এলাকায় সেসব মোটরসাইকেল অল্প দামে বিক্রি করা হতো।

তবে বিক্রির সময় বলা হতো এগুলো ভারতীয় সীমান্ত থেকে আনা হয়েছে, ফলে কম দাম পড়ছে। চক্রটি আড়াই লাখ টাকার মোটরসাইকেল বিক্রি করতো ৪০ থেকে ৮০ হাজারে।

পুলিশ জানায়, অভিযুক্তরা বড়লোক হওয়ার নেশায় গত আট বছরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে পাঁচ শতাধিক মোটরসাইকেল চুরি করেছে। চুরি করা মোটরসাইকেলগুলোর মধ্যে অধিকাংশই সুজিকি ব্র্যান্ডের জিক্সার মডেলের।

গ্রেপ্তাররা হলেন, চক্রের মুলহোতা নূর মোহাম্মদ (২৬), অন্যতম সহযোগী রবিন (২৩), সজল (১৮), মনির (২২) ও আকাশ (২২)। এ সময় তাদের কাছ থেকে ১৩টি চোরাই মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়।

বুধবার (১৭ আগস্ট) দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ।

মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, প্রথমে মোটরসাইকেল চোর চক্রের দুই সদস্য নুর মোহাম্মদ ও রবিনকে যাত্রাবাড়ীর শনিরআখড়া এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে চক্রের অন্য তিন সদস্য সজল, মনির ও আকাশকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন মডেলের ১৩টি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়। এর মধ্যে সুজুকি ব্র্যান্ডের জিক্সার মডেলের সংখ্যাই বেশি।

তিনি বলেন, মোটরসাইকেল চুরির জন্য তাদের টার্গেটেড এরিয়া ছিল পুরান ঢাকা। ওই এলাকায় সুজুকি জিক্সার মডেলের মোটরসাইকেল চুরি করত তারা। গত কয়েক বছরে এই চক্রের সদস্যরা অন্তত ৫০০ মোটরসাইকেল চুরি করেছে। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ দেখে তাদের চেহারার সঙ্গে মিল পাওয়ায় যায়। এরপর অভিযান চালিয়ে প্রথমে চক্রের মূল হোতা নূর মোহাম্মদ ও রবিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর নুর মোহাম্মদের তথ্য অনুযায়ী যাত্রাবাড়ীর ধলপুর এলাকা থেকে সজল, মনির এবং আকাশকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তার নূর মোহাম্মদের বিষয়ে ডিবি প্রধান বলেন, সে মূলত জুরাইন এলাকায় একটি কাঠের দোকানে নকশার কাজ করত। আগে তার বাসা ছিল ঢাকার কেরানীগঞ্জে হাসনাবাদ এলাকায়। একদিন হাসনাবাদ গলির ভেতর চায়ের দোকানে রবিনের সঙ্গে পরিচয় হয়। দুইজন মিলে পরিকল্পনা করে, কীভাবে দ্রুত সময়ে বড়লোক হওয়া যায়। নুর মোহাম্মদ রবিনকে বলে, তার কাছে করাত ধার দেওয়ার রেদ আছে যা দিয়ে মোটরসাইকেলের চাবি পাতলা করে ‘মাস্টার কি’ বানানো যাবে। পরিকল্পনা মোতাবেক রবিনের জিক্সার মোটর সাইকেলের চাবি রেদ দিয়ে ঘষে পাতলা করে শারিঘাটে পার্ক করা একটি জিক্সার মোটরসাইকেল পরীক্ষামূলকভাবে চুরি করে। এরপর থেকে তারা এ চাবিকেই ‘মাস্টার কি’ হিসেবে ব্যবহার করে দুই বন্ধু দীর্ঘদিন ধরে মোটরসাইকেল চুরি করে আসছে।

তিনি বলেন, চোরাই মোটরসাইকেল বিক্রি করার জন্য তারা ঢাকার দোহারে সজলকে তাদের চক্রের সদস্য হিসেবে যুক্ত করে। ঢাকা মহানগর এলাকা থেকে মোটরসাইকেল চুরি করে নিরাপদ রোড হিসেবে পোস্তগোলা ব্রিজ পার হয়ে মাওয়া রোডের শ্রীনগর বাইপাস হয়ে মেঘুলা বাজার, দোহার রুট ব্যবহার করে। অন্যদিকে বাবুবাজার ব্রিজ পার হয়ে কেরানীগঞ্জ, জয়পাড়া ও দোহার এলাকা যাওয়ার রুট হিসেবে ব্যবহার করে। সজল ও মনির দোহারের বিভিন্ন এলাকার সাধারণ মানুষদের চোরাই মোটরসাইকেল ইন্ডিয়ান বর্ডার ক্রস গাড়ি বলে বিক্রি করে আসছিল।

গ্রেপ্তার সজলকে জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে তিনি বলেন, সে নিজেও বড়লোক হওয়ার নেশায় দোহারের মেঘুলা বাজারের একজন ধনি বেকারি ব্যবসায়ীর মেয়েকে পালিয়ে নিয়ে বিয়ে করে। কিন্তু মেয়ের মা-বাবা তাদের মেয়ের সঙ্গে সজলের সম্পর্ক ছিন্ন করলে সজল হতাশ হয়ে বড়লোক হওয়ার নেশায় আসামি নুর মোহাম্মদ ও রবিনদের চক্রে যোগ দেয়। গ্রেপ্তার সজল, মনির ও আকাশদের মূল কাজ ছিল দোহার ও আশপাশের এলাকা থেকে চোরাই মোটরসাইকেল বিক্রির জন্য ক্রেতা খুঁজে বের করা। প্রতিটি চোরাই মোটরসাইকেল তারা ৪০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি করত। বিক্রির টাকা নূর মোহাম্মদ ৪০ শতাংশ রবিন ৩০ শতাংশ ও অবশিষ্ট টাকা অন্য ভাগ করে নিত।

জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তাররা জানায়, তারা ২০১৫ সাল থেকে মোটরসাইকেল চুরি করে আসছে। এ পর্যন্ত ৫০০ টিরও বেশি মোটরসাইকেল চুরি করেছে।

আরও পড়ুন