নজর২৪, ঢাকা- ধনকুবের হিসেবে বহুল পরিচিত মুসা বিন শমসের ওরফে প্রিন্স মুসা। জনশ্রুতি রয়েছে সুইচ ব্যাংকসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ও ব্যাংকে তার কোটি কোটি টাকা রয়েছে। তবে মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে (ডিবি) মুসাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর ডিবি কর্মকর্তারা বলছেন, ‘তার সম্পদের সবই মিছে। সুইস ব্যাংকে তার এক টাকাও নেই। মুসার বিপুল অর্থ-বিত্ত নিয়ে যেসব জনশ্রুতি আছে তা মিথ্যা। সম্পদ নিয়ে তিনি মুখরোচক কথা বলেন।’
প্রসঙ্গত, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সংস্থা বা ব্যক্তিকে মোটা অঙ্কের অর্থ অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে আলোচনার জন্ম দেন মুসা। যুক্তরাজ্যে নির্বাচনের আগে তিনি অনুদানের ঘোষণা দেন। পদ্মা সেতু নিয়ে যখন বিশ্বব্যাংকের টানাপোড়েন চলছিল তখনও সুইস ব্যাংকে টাকা আছে দাবি করে মুসা বলেন- উদ্ধার করতে পারলে ওই অর্থ দিয়ে পদ্মা সেতু করে দেবেন। মঙ্গলবারও ফের মুসা বলেছেন- সেই সুইচ ব্যাংকের অর্থ উদ্ধার করতে পারলে পুলিশকে ৫০০ কোটি টাকা দেবেন। দুদককে ২০০ কোটি টাকা দিয়ে ভবন করে দেবেন এবং দ্বিতীয় পদ্মা সেতু তৈরি করে দেবেন।
তবে মুসাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর ডিবির গুলশান বিভাগের ডিসি মশিউর রহমান বলেন, ‘মুসা নিজের অর্থ সম্পদ নিয়ে যা দাবি করছেন তা আসলে ফাঁকা বুলি। মুখরোচক গল্প বলতে পছন্দ তার। সুইস ব্যাংকে তার কোনো অর্থই নেই। প্রতারক কাদেরের সঙ্গে উল্টো বাটপারি করতে চেয়েছিলেন মুসা।’
এর আগে প্রতারণা করে অঢেল অর্থ-সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগে রাজধানী থেকে গ্রেপ্তার হওয়া আবদুল কাদের চৌধুরী ওরফে কাদের মাঝির সঙ্গে সংশ্নিষ্টতায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বিতর্কিত ব্যবসায়ী মুসা বিন শমসের স্ত্রী-পুত্র নিয়ে মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে যান। বিকেল ৩টা ২৫ মিনিটে মেরুন রঙের এফ প্রিমিও গাড়িতে করে তারা ডিবি কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। সাড়ে তিন ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর সন্ধ্যা ৬টা ৫৫ মিনিটের দিকে তিনি ডিবি কার্যালয় থেকে বের হন।
মুসা বিন শমসেরকে জিজ্ঞাসাবাদের পর ডিবির যুগ্ম কমিশনার হারুন অর রশিদ বলেন, ‘আমরা কয়েক ঘণ্টা কথা বলেছি। উনাকে আমার কাছে রহস্যময় মানুষ মনে হয়েছে। উনাকে বারবার জিজ্ঞেস করেছি, আবদুল কাদের একটি নাইন পাশ লোক। তাকে আপনি এত বড় কোম্পানির উপদেষ্টা বানালেন! সে আপনাকে ১০ কোটি টাকার চেক দিল, আপনি তাকে ২০ কোটি টাকার চেক দিলেন! তিনি বলেন লাভসহ দিয়েছি। এক মাসে কেউ কি ১০ কোটি টাকায় ১০ কোটি টাকা লাভ দেয়? উনি দেখেছেন কাদের মাঝি অনেক বড় বড় লোকের সঙ্গে কথা বলেছেন। কিন্তু বাস্তবে দেখলাম তার (কাদের) সঙ্গে অজস্র কথোপকথন আছে। উনি তাকে বাবা সোনা ডাকেন এবং তার ছেলের চেয়েও তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।’
মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ বলেন, ‘আমি উনাকে (মুসা বিন শমসের) বললাম, আপনার সুইস ব্যাংকে ৮২ বিলিয়ন টাকা; এর কাগজ কাদেরের ওখানে থাকে কেন? উনি (মুসা বিন শমসের) বলেন, তার নাকি ৮২ বিলিয়ন ডলার আছে। তার একটি কলমের দাম ১০ কোটি টাকা। ঘড়ির দাম ৮ কোটি টাকা। জুতার দাম ১০ কোটি। তিনি টাঙ্গাইলে তিন লাখ একর জমির মালিক। গাজীপুরে এক হাজার একর জমির মালিক। উনি আমাদের সামনে বললেন।
তিনি আমাদের বলেন, তিনি যদি ৮২ বিলিয়ন ডলার সুইস ব্যাংক থেকে পান, উনি আমাদের পুলিশকে দেবেন ৫০০ কোটি টাকা, দুদকের বিল্ডিং করতে দেবেন ২০০ কোটি টাকা। পাবনার মেন্টাল হাসপাতালে দেবেন ৫০০ কোটি টাকা। দ্বিতীয় পদ্মা সেতু করে দেবেন উনি। আমাদের সামনে এগুলো বলেছেন। আসলে উনি কী টাইপের মানুষ। কী রহস্যের মানুষ আমরা বুঝিনি।
তবে উনি দায় এড়াতে পারেন না। উনার সঙ্গে ভুয়া অ্যাডিশনাল সেক্রেটারি কাদের মাঝির যে সম্পর্ক, এ সম্পর্কের দায় উনি এড়াতে পারবেন না। কারণ উনার সঙ্গে কাদেরের একটি হৃদ্য সম্পর্ক ছিল। যে সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে কাদের মাঝি বিভিন্ন মানুষকে ঠকিয়েছেন।’
এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘কাদের মাঝি যে বলেছে তার সঙ্গে আইজির সম্পর্ক আছে, অনেক বড় বড় মানুষের সম্পর্ক আছে, উনার (মুসা বিন শমসের) উচিত ছিল আমাদের ইন্সপেক্টর জেনারেল পুলিশকে জিজ্ঞেস করা বা অন্যান্য যে ভিআইপিদের নাম বলেছে, তাদের জিজ্ঞেস করা। উনি এটি জিজ্ঞেস করেননি। অতএব, আমি মনে করি কাদের মাঝির সঙ্গে তার একটি যোগসূত্র রয়েছে এবং উনি নিজে বলেছেন উনি প্রতারিত হয়েছেন। উনি একটি মামলা করবেন। আমরা সবকিছু তদন্ত করছি। তদন্ত করে যেটা করা দরকার, সেটাই করব। আর উনি যদি মামলা করেন সেটিও আমরা তদন্ত করব।’
মুসা বিন শমসের দাবি করেছেন উনি অনেক সম্পদের মালিক, আপনাদের কাছে কী মনে হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে যুগ্ম কমিশনার বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়েছে উনি অন্তঃসারশূন্য। উনাকে একটি ভুয়া লোক মনে হয়েছে। তার কিচ্ছু নাই। গুলশানে ৮৪ নম্বর রোডে তার স্ত্রীর নামে একটি বাড়ি রয়েছে। বাংলাদেশে তার নামে আমরা কিছু পাইনি। উনি বলেছেন, এ দেশে যা উন্নয়ন হয়েছে, সবটাই উনি করেছেন। উনি খামখেয়ালির বশে যে কথা বলেছেন, সেটি কাদের মাঝি সবখানে বিক্রি করেছে।’
