নজর২৪ ডেস্ক- যাত্রীসেবার মান বাড়াতে এবং রেলকে আধুনিকায়ন করতে কেনা হয়েছিল ডিজেল ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট (ডেমু) ট্রেন। এত মানও বাড়েনি, আধুনিকতার ছোঁয়াও লাগেনি। বরং ডেমু ট্রেন কেনা থেকে শুরু করে মেরামতের নামে কর্মকর্তাদের পকেট ভারি হয়েছে। এটি পরিচালনা করতে গিয়ে রেলের লোকসানের বোঝা বেড়েইে চলেছে।
৬৫৪ কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা ডেমু ট্রেন নিয়ে শুরুতেই দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। যে কারণে কয়েক মাসের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যায় ১০ সেট ট্রেন। এরপর বছরজুড়েই বিকল হতে থাকায় ডেমু ট্রেন মেরামতেও নানান জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন রেলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
জানা যায়, দুই লাখ টাকা দামের যন্ত্রাংশ কেনা হয়েছে ৪২ লাখ টাকায়। ইঞ্জিনের বিশেষ মেরামতের নামে ৮ কোটি ২৫ লাখ টাকার সীমাহীন লুটপাটের অভিযোগ গড়িয়েছে দুদক পর্যন্ত। মালামাল কেনা হয়েছে ১০ থেকে ২০ গুণ বেশি দামে।
এসব অভিযোগ রেলওয়ে অতিরিক্ত মহাপরিচালক মঞ্জুর-উল-আলম চৌধুরীর বিরুদ্ধে, তবে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি। এদিকে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন রেলমন্ত্রী।
সূত্র জানায়, ২০১৩ সালে ৬৫৪ কোটি টাকায় ২০টি ডেমু ট্রেন কেনার পর থেকেই বিকল হতে শুরু করে। দীর্ঘদিন পড়ে থাকার পর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৮ কোটি ২৫ লাখ টাকায় ১৭টি ডেমুকে বিশেষ মেরামত “ওভার হোলিং” করার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ রেলওয়ে।
বাংলাদেশে ডেমুর কোনো ওয়ার্কশপ, যন্ত্রাংশ কিংবা মেকানিক না থাকায়, চুক্তিতে শর্ত থাকলেও ডেমু উৎপাদনকারী চাইনিজ প্রতিষ্ঠান তাংশেনকে রাখা হয়নি মেরামতে। আবার এর ইঞ্জিন নির্মাতা জার্মানির প্রতিষ্ঠান ম্যানের কাছ থেকেও কেনা হয়নি কোনো যন্ত্রাংশ। শর্ত ভঙ্গ করে দুটি কাজই দেওয়া হয়েছে দেশীয় প্রতিষ্ঠান ফারুক মেটাল ইঞ্জিনিয়ারিংকে। যাদের কোনো অভিজ্ঞতাই নেই।
মেরামতে কর্মরত শ্রমিকরা বলেন, চীন বা জার্মানির কোনো প্রতিনিধি এখানে ছিল না। আমরা নিজেরাই শিখি। আমাদের কোনো ট্রেইনারও নেই।
৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে মেরামত করা হলেও, এখনো ডেমুগুলো নানা সমস্যায় জর্জরিত। নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে যন্ত্রাংশ কেনা হয়েছে, যা নিম্নমানের বলে অভিযোগ ডেমু মেকানিকদের।
তারা বলেন, হাওয়া লিক হয়ে যায়। দুর্বল যন্ত্রাংশের কারণে প্রায়ই সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
সম্প্রতি ডেমু মেরামতে দুর্নীতির অভিযোগ দুদকেও দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়, প্রতিটি যন্ত্রাংশ কেনা হয়েছে ২০ গুণ পর্যন্ত বেশি দামে।
অভিযোগে ডেমুর ১০টি এইচএমআই ডিসপ্লে কেনায় অনিয়মের উদাহরণও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, এইচএমআইয়ের প্রতিটির দাম সর্বোচ্চ দুই হাজার ডলার হলেও ৪৯ হাজার ৮০০ ডলারে তা কেনা হয়েছে। এতে প্রায় চার কোটি টাকার দুর্নীতি করা হয়েছে। এছাড়া জাম্পার কেবল কেনা হয়েছে প্রতিটি চার হাজার ডলারে। যদিও এগুলোর দাম সর্বোচ্চ ২০০ ডলার।
এসব অভিযোগ রেলের বর্তমান অতিরিক্ত মহাপরিচালক রোলিং স্টক মঞ্জুর-উল-আলম চৌধুরীর বিরুদ্ধে। যিনি সেই সময় মেকানিক্যাল বিভাগের যুগ্ম পরিচালক ছিলেন।
জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি এসব না জেনে বলতে পারব না। কারা কিনেছে, কখন কিনেছে আমাকে জানতে হবে।
এদিকে এসব অভিযোগের বিষয়টি নজরে আনলে তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসের কথা জানিয়েছেন রেলপথ মন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন।
উল্লেখ্য, বর্তমানে ২০টি ডেমুর বেশির ভাগই বিকল হয়ে পড়ে আছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম লোকশেডে।
